বহুতল ভবনে লিফট ব্যবহারের সময় অনেকেরই একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা হয়—লিফট যখন ওপরের দিকে যাত্রা শুরু করে, তখন পায়ের তলায় অতিরিক্ত চাপ অনুভূত হয়, মনে হয় যেন ওজন বেড়ে গেছে। আবার লিফট যখন নির্দিষ্ট তলায় পৌঁছে থামার জন্য গতি কমায়, তখন শরীর হালকা লাগে। এই ঘটনা শুধু মানসিক ভুল নয়, বাস্তবেই ওজন মাপার যন্ত্রে এই পরিবর্তন ধরা পড়ে। লিফট নিচে নামার সময় এর উল্টো ঘটনা ঘটে—নামা শুরু করলে হালকা লাগে, আর থামার সময় ভারী লাগে।
পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রহস্যের সমাধান করতে হলে প্রথমে ‘ওজন’ ধারণাটি স্পষ্ট করতে হবে। ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিগুয়েল মোরালেসের মতে, ওজনের অন্তত তিনটি অর্থ রয়েছে: প্রথমত, ভর বা শরীরে কতটুকু পদার্থ আছে; দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কতটা জোরে টানছে; এবং তৃতীয়ত, মেঝে কত জোরে ওপরের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। সাধারণ অবস্থায় মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকলে এই তিনটি মান সমান থাকে। কিন্তু লিফটের গতি বাড়া বা কমানোর সময় তৃতীয় বিষয়টি—মেঝের ওপরমুখী প্রতিক্রিয়া বল—বদলে যায়।
লিফট ওঠানামার সময় শরীরের ভর একটুও পরিবর্তন হয় না, এবং ভবনের নিচতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত মহাকর্ষ বলের টান প্রায় একই থাকে। তাহলে কী বদলায়? বদলায় মেঝে কত জোরে ওপরের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে। ওজন মাপার যন্ত্র বা স্কেল আসলে এই ওপরমুখী ধাক্কাটি মাপে। ইউনিভার্সিটি অব আইডাহোর পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেসন বার্নসের মতে, মানুষ মহাকর্ষ বল কখনো সরাসরি অনুভব করতে পারে না। মহাকাশচারীদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করলেও সেখানে মহাকর্ষ বল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৯০ শতাংশ শক্তিশালী। কিন্তু মহাকাশচারীরা ওজনহীন মনে করেন, কারণ স্টেশন ও তারা একই গতিতে পৃথিবীর চারদিকে পড়তে থাকে—ঘণ্টায় ২৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি বেগে। এই অবিরাম পতনের কারণে মেঝের আর ওপরমুখী ধাক্কা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, ফলে ওজনহীনতা অনুভূত হয়।
লিফটে ফিরে আসা যাক। লিফট যখন ওপরের দিকে ওঠা শুরু করে, তখন এটি ওপরের দিকে ত্বরণ সৃষ্টি করে। এই ত্বরণের ফলে লিফটের মেঝেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোরে ধাক্কা দিতে হয় যাত্রীকে ওপরের দিকে তুলতে। এই বাড়তি ধাক্কার কারণেই যাত্রী নিজেকে ভারী মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ, লিফট যদি সেকেন্ডে ১ মিটার বর্গ ত্বরণে ওপরে ওঠে (যা পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের প্রায় এক-দশমাংশ), তাহলে একজন ৬৮ কেজি ওজনের ব্যক্তির ওজন স্কেলে প্রায় ৭৫ কেজি দেখাতে পারে। লিফট যখন স্থির গতিতে ওপরে উঠতে থাকে, তখন আর ত্বরণ থাকে না, ফলে মেঝের ধাক্কা ও মহাকর্ষ বল সমান হয়ে যায় এবং ওজন স্বাভাবিক মনে হয়।
ওপরের তলায় পৌঁছানোর আগে লিফট যখন থামার জন্য গতি কমায়, তখন নিচের দিকে সামান্য ত্বরণ তৈরি হয়। ফলে মেঝেকে আর আগের মতো জোরে ওপরের দিকে ধাক্কা দিতে হয় না, স্কেলে ওজন কমে যায় এবং যাত্রী হালকা বোধ করেন। নিচে নামার সময় একই প্রক্রিয়া ঘটে: নামা শুরু করলে মেঝের ধাক্কা কমে বলে হালকা লাগে, আর থামার সময় গতি কমানোর জন্য মেঝে আবার জোরে ধাক্কা দেয়, ফলে ভারী লাগে।




