ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, ফুটবল খেলা কেবল বিনোদন নয়; এটি কখনও কখনও যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে, আবার কখনও সেই আগুন নেভাতেও ভূমিকা রেখেছে। ১৯১৪ সালের বড়দিনের ঘটনা তার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বেলজিয়ামের ফ্রেলিঙ্গিয়েন গ্রামের কাছে ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্যরা ট্রেঞ্চ থেকে বেরিয়ে এসে নো ম্যানস ল্যান্ডে একসঙ্গে ফুটবল খেলেন। যুদ্ধের মাঝে কাদামাখা বুট পরে এই খেলা চলেছিল মাত্র কিছু সময়ের জন্য, কিন্তু তা শান্তির প্রতীক হয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। পরবর্তীকালে ওই স্থানে 'ক্রিসমাস ট্রুস' নামে একটি ভাস্কর্য নির্মিত হয়, যা এখনো স্মৃতি বহন করছে।
নাইজেরিয়ায়ও ফুটবলের কারণে যুদ্ধ থেমেছিল। ১৯৬৯ সালে সেদেশে গৃহযুদ্ধ চলাকালে ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে ও তাঁর ক্লাব সান্তোস সেখানে প্রীতি ম্যাচ খেলতে যায়। পেলের উপস্থিতির কারণে দুই পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। ম্যাচটি ২-১ গোলে জেতে সান্তোস। পেলে পরে সামাজিক মাধ্যমেও এই ঘটনাকে তাঁর ক্যারিয়ারের গর্বের মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেন। তবে সতীর্থদের মতে, যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এবং বিমান উড়াল দেওয়ার পর আবার গোলাগুলি শুরু হয়।
আইভরিকোস্টের উদাহরণ আরও স্পষ্ট। ২০০৫ সালে দিদিয়ের দ্রগবার নেতৃত্বে জাতীয় দল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। সেই সময় দেশে চলছিল রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। ম্যাচ শেষে সাজঘরে দ্রগবা দেশবাসীর উদ্দেশে এক আবেগঘন বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, 'উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি। দয়া করে অস্ত্র সমর্পণ করুন এবং নির্বাচনের পথে আসুন।' এই বক্তৃতা পুরো দেশে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং অবশেষে সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর বাওয়াকুতে মাদাগাস্কারের বিপক্ষে ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়া আরও জোরালো হয়।
বিপরীত চিত্রও কম নেই। ১৯৯০ সালে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের সময় জভোনিমির বোবানের একটি লাথি ইতিহাসে স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে যায়। ডায়নামো জাগরেব ও রেড স্টার বেলগ্রেডের ম্যাচে পুলিশি বর্বরতার প্রতিবাদে বোবান এক পুলিশ অফিসারকে লাথি মারেন। পরে এই ঘটনা ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধের সূত্রপাত বলে বিবেচিত হয়। তাঁকে যুগোস্লাভ জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং তিনি এসি মিলানে চলে যান। ২০১১ সালে সিএনএন এই ম্যাচটিকে বিশ্ব পরিবর্তনকারী পাঁচটি ফুটবল ম্যাচের একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
হন্ডুরাস ও এল সালভাদরের মধ্যে ১৯৬৯ সালের 'ফুটবল যুদ্ধ' সবচেয়ে চিহ্নিতযোগ্য। ১৯৭০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চরমে ওঠে। প্রথম ম্যাচে হন্ডুরাস জিতলে পরের ম্যাচে সালভাদরের সমর্থকরা হন্ডুরাস দলকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। প্লে-অফ ম্যাচে জিতে সালভাদর বিশ্বকাপে যায়। তবে ম্যাচের ১৬ দিন পর দুই দেশের মধ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়। সেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষ মারা যায় এবং লাখো লোক বাস্তুচ্যুত হয়। ফুটবল সরাসরি যুদ্ধের কারণ না হলেও তা ট্রিগারের কাজ করেছিল।
সব মিলিয়ে ফুটবল খেলা কেবল মাঠে নয়, মাঠের বাইরেও গভীর প্রভাব ফেলে। এটি যেমন দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে, তেমনই শান্তির পথও দেখাতে পারে। ইতিহাসের এসব অধ্যায় তা প্রমাণ করে।

