যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কমিশন (এনআরসি) একটি মৌলিক নিরাপত্তা নীতি বাতিলের প্রস্তাব করেছে, যা গত ৫০ বছর ধরে দেশটির জনগণের বিকিরণ সংস্পর্শ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে সহায়তা করছে। ‘আলারা’ (এএলএআরএ) নামে পরিচিত এই নীতি অনুযায়ী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো স্থাপনাগুলোতে বিকিরণ সংস্পর্শ ‘যতটা সম্ভব কম রাখা’ বাধ্যতামূলক ছিল। নতুন প্রস্তাবে এই দর্শন পরিত্যাগ করে একটি ‘গ্রেডেড অ্যাপ্রোচ’ চালু করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে কর্মীদের সম্ভাব্য বিকিরণ মাত্রার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান সর্বোচ্চ বিকিরণ সীমা অপরিবর্তিত থাকলেও, নীতি পরিবর্তনের ফলে পারমাণবিক শক্তি উন্নয়নে গতি আসবে বলে আশা করছে এনআরসি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দেশীয় পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন চারগুণ করার চেষ্টা করছেন। এনআরসি সংস্কারকে তিনি চুল্লি উন্নয়নের গতি বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে দেখছেন। গত বছর এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প সংস্থাটিকে ‘বিজ্ঞানভিত্তিক বিকিরণ সীমা’ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে জ্বালানি বিভাগ আলারা ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। এনআরসি আগামী মাসগুলোর মধ্যে নতুন বিকিরণ সুরক্ষা নিয়ম চূড়ান্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এনআরসি চেয়ারম্যান হো নিহ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কমিশন নিরাপত্তার মান কমাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল অস্পষ্টতা দূর করছি। কর্মী ও জনগণের সংস্পর্শের মান অপরিবর্তিত থাকছে। আমরা কেবল আরও স্পষ্টতা আনছি।’ নিহের মতে, বিদ্যমান বড় চুল্লিগুলোতে তেমন পরিবর্তন আসবে না, তবে নতুন ছোট চুল্লি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিকিরণ সুরক্ষার স্পষ্ট নির্দেশনা পেলে দ্রুত এগোতে পারবে।

পারমাণবিক শক্তি শিল্পের বাণিজ্য সংস্থা নিউক্লিয়ার এনার্জি ইনস্টিটিউটের প্রধান পারমাণবিক কর্মকর্তা ডগ ট্রু বলেন, ‘আমরা সবসময় কর্মীদের ডোজ কমানোর চেষ্টা করব এবং অফ-সাইট জনগণের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কম রাখব। এর অর্থ এই নয় যে আমরা সবকিছু খুলে দিয়ে সীমা পর্যন্ত পৌঁছাতে দেব।’ পারমাণবিক শক্তি পরামর্শক জাস্টিন ফ্রিডম্যান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে তিন দশক কাটিয়েছেন, মনে করেন আলারা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি ‘চলমান লক্ষ্য’ তৈরি করেছিল। নিয়মটি বাতিল করলে এনআরসির বিজ্ঞানীরা গ্রহণযোগ্য ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে আরও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ এই পরিবর্তনের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক শক্তি নিরাপত্তা পরিচালক এডউইন লিম্যান সতর্ক করে বলেন, প্রস্তাবের কিছু অংশ নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনুমোদিত বিকিরণ মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যদিও তা সীমার নিচে থাকবে। তিনি বিশেষ করে রেডিওনিউক্লাইড নির্গমন মান পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করেন। বর্তমানে সাধারণ জনগণের জন্য বার্ষিক বিকিরণ সীমা ১০০ মিলিরেম, যেখানে বুকের এক্স-রেতে মাত্র ১০ মিলিরেম। এনআরসি রক্ষণশীল ১০ মিলিরেম থেকে বাড়িয়ে ২৫ মিলিরেম করার প্রস্তাব দিয়েছে, যা একটি পারমাণবিক কেন্দ্রের সীমানায় বসবাসকারী কল্পিত ব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে। এনআরসি বলছে, বাস্তবে মানুষ কেন্দ্র থেকে দূরে থাকে এবং বাতাস ও পানিতে বিচ্ছুরণের কারণে প্রকৃত মাত্রা আরও কম হবে। লিম্যানের মতে, আলারা বাতিল না করে উন্নত করাই উচিত।

সাবেক সহকারী জ্বালানি সচিব কেটি হাফ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে আলারা নিয়ন্ত্রণ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। অতিরিক্ত স্পষ্টতা নিয়ন্ত্রক পরিবেশ উন্নত করবে, জনগণের ক্ষতি না করেই। তবে তিনি ভেবেছিলেন এনআরসি আলারা বাতিল না করে ‘যুক্তিসঙ্গত’ শব্দটির স্পষ্টতা দেবে। গ্রেডেড অ্যাপ্রোচ কার্যকর হবে কিনা তা দেখার জন্য তিনি উন্মুক্ত।

ন্যাশনাল কাউন্সিল অন রেডিয়েশন প্রোটেকশন অ্যান্ড মেজারমেন্টসের সভাপতি ক্যাথরিন হিগলি ব্যক্তিগতভাবে ১৮০ পৃষ্ঠার নথির কিছু অংশ পছন্দ করেছেন এবং কিছু অংশ সমস্যাজনক মনে করছেন। তিনি বলেন, এনআরসির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার পুরো চিত্র দেখা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, আলারা মেনে একজন কর্মী পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক পোশাক ও শ্বাসযন্ত্র পরলে ধীরে চলবেন, যা তাপজনিত চাপ তৈরি করতে পারে। এই চাপ কম মাত্রার বিকিরণের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। হিগলির আরেকটি উদ্বেগ হলো প্রস্তাবে প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীদের জন্য বার্ষিক ৫ রেম (৫০০০ মিলিরেম) পেশাগত ডোজ সীমা বহাল রাখা। আলারা কার্যকর থাকায় গড় ডোজ এই সীমার নিচে ছিল। আন্তর্জাতিক কমিশন অন রেডিওলজিক্যাল প্রোটেকশন গড়ে ২ রেম বার্ষিক পেশাগত ডোজ সুপারিশ করে। হিগলি মনে করেন, আলারা বাতিল হলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হতে পারে।