রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কলিমউল্লাহ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আবু সাঈদ নিহত হওয়ার প্রতিবাদে তিনিই প্রথম কথা বলেছিলেন। তিনি আদালতকে জানান, সেই প্রতিবাদের রেকর্ডও রয়েছে। তিনি জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে নন বরং সমর্থন করেছিলেন বলেও মন্তব্য করেন।
মামলাটি গত বছরের ১৪ অক্টোবর ভুক্তভোগী মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় উত্তরা রবীন্দ্রসরণি রোড এলাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। সে সময় একটি গুলি বাদীর বাঁ হাতের কনুই ভেদ করে বেরিয়ে যায় এবং আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উত্তরা হাইকেয়ার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়।
২৮ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. আবু সাঈদ কলিমউল্লাহকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন জানান। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে এই ঘটনায় জড়িত থাকার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং তিনি বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন, তাই তদন্ত স্বার্থে তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে রাখা প্রয়োজন। আদালত ওই দিনই শুনানির জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেন।
শুনানিতে কলিমউল্লাহর পক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশীদ গ্রেপ্তার দেখানোর বিরোধিতা করে বলেন, তিনি একজন অধ্যাপক, শিক্ষকতাই তাঁর কাজ; গুলি চালানোর ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই। তিনি আরও যুক্তি দেন, মামলায় ৯০ জন আসামির মধ্যে কলিমউল্লাহর নাম ৬১-৬২ নম্বরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মামলায় তিনি আগেই কারাগারে রয়েছেন এবং সেখান থেকে জামিন পেয়েছেন। এত দিন পর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন বোধগম্য নয় বলে মন্তব্য করেন এই আইনজীবী। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন কলিমউল্লাহকে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট কাঠামো তৈরির অন্যতম কারিগর এবং ‘দিনের ভোট রাতে করানো’র বৈধতা দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি ও লাশ গুমের ঘটনার সঙ্গে কলিমউল্লাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কলিমউল্লাহ নিজের বক্তব্যে বলেন, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনের সময় তিনি যা দেখেছেন তা-ই বলেছেন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তাঁর নির্ধারিত দায়িত্ব ছিল, এর আগে বা পরে কী ঘটেছে তা তাঁর জানা নেই। বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, দায়িত্বের আগে বা পরে কোনো অভিযোগ থাকলে তা দেখা কি তাঁর কর্তব্য নয়? জবাবে কলিমউল্লাহ বলেন, এই বিষয়ে তাঁর অনেক আর্টিকেল রয়েছে। বিচারক তাঁকে জানান, তিনি সেসব আর্টিকেল পড়েছেন।
শুনানি শেষে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত কলিমউল্লাহকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন। এর আগে দুপুরে হাজতখানা থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে বুলেটপ্রুভ জ্যাকেট, হেলমেট ও হাতকড়া পরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে আদালতে আনা হয়। শুনানি শেষে নামানোর সময় তিনি কথা বলতে চাইলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা বাধা দেন। ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। ওই দিনই জামিন আবেদন নাকচ করে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠায় এবং সেখান থেকেই বর্তমানে তিনি আছেন।




