ডিজিটাল যুগে যখন গোটা বিশ্ব একে অপরের সঙ্গে মুহূর্তেই যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, তখনও পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কিছু জনগোষ্ঠী ইচ্ছে করেই আধুনিক সভ্যতার আলো থেকে নিজেদের দূরে রেখেছে। গবেষকদের হিসাব মতে, বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৯৬টি এমন জনগোষ্ঠী রয়েছে যারা বাইরের মানুষের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না। এদের মূল অবস্থান ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ভারতসহ প্রায় ১০টি দেশের দুর্গম জঙ্গল, নির্জন দ্বীপ বা মরুভূমি অঞ্চলে।

তবে এই জনগোষ্ঠীগুলোর জীবনধারা একরকম নয়। কেউ কেউ মাঝে মাঝে পার্শ্ববর্তী অন্য আদিবাসীদের সঙ্গে দেখা করে, আবার অনেককেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও বহিরাগতদের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ, কাঠ, তেল বা খনিজ সম্পদের সন্ধানে বড় বড় কোম্পানি তাদের বসতি এলাকা দখল করে নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন বা একা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রশ্নের একটি নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, কোনো দলকে যোগাযোগহীন বলার কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। বিভিন্ন সংস্থা তাদের ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে, যেমন—স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন, লুকানো বা অদৃশ্য জনগোষ্ঠী।

সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের গবেষক হ্যাল রাসেল জানান, যারা বাইরের জগৎ সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও কারও সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক স্থাপন করে না এবং সবাইকে এড়িয়ে চলে, তাদেরই মূলত যোগাযোগহীন জনগোষ্ঠী বলা হয়। নিজেদের ঐতিহ্য ও আলাদা জীবনধারা ধরে রাখার জন্যই তারা অন্য সংস্কৃতির মানুষের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকে। অর্থাৎ, তারা কারও দ্বারা বিরক্ত হতে চায় না।

এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো সেন্টিনেলিজ জনগোষ্ঠী। বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের উত্তর সেন্টিনেল দ্বীপে তারা বসবাস করে। নৃবিজ্ঞানীরা তাদের নিজস্ব নাম জানেন না; দ্বীপের নাম অনুসারেই তাদের সেন্টিনেলিজ বলা হয়। প্রায় ২৩ বর্গমাইলের এই দ্বীপে তারা প্রায় ৫৫ হাজার বছর ধরে রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তারা শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে জীবনধারণ করে এবং কাঠের তৈরি ছোট নৌকায় উপকূলে মাছ ধরে। সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনালের মতে, তাদের সংখ্যা ৫০ থেকে ১৫০ জন হতে পারে। তবে দুর্গম দ্বীপ ও তাদের আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে সঠিক জনসংখ্যা জানা সম্ভব নয়।

সেন্টিনেলিজদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হয়। তাদের দ্বীপে কোনো নৌকা বা হেলিকপ্টার গেলে তারা তির-ধনুক নিয়ে হামলা করে। ২০১৮ সালে বেআইনিভাবে দ্বীপে ঢোকা মার্কিন ধর্মপ্রচারক জন অ্যালেন চাউসহ অন্তত তিনজনকে তারা হত্যা করেছে। তাই ভারত সরকার সেন্টিনেলিজদের জীবন ও বহিরাগতদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্বীপে যাওয়া নিষিদ্ধ করেছে।

যোগাযোগহীন আদিবাসীদের একটি বড় অংশ আমাজন অববাহিকায় বাস করে। এর মধ্যে মধ্য পেরুর কাকাতাইবো জনগোষ্ঠী সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। তারা এতটাই গোপনীয় যে বনজঙ্গলে হাঁটার পর মাটি দিয়ে পায়ের ছাপ পর্যন্ত মুছে ফেলে। এটি তাদের আত্মরক্ষার একটি কৌশল। অতীতে বাইরের মানুষের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না বলেই এমন আচরণ। একইভাবে ব্রাজিলের কাওয়াহিভা জনগোষ্ঠী এতটাই আড়ালে থাকে যে ১৯৯৯ সালে মাত্র একটি ভিডিওর ভিত্তিতে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ২০২১ সালে ব্রাজিলে নতুন এক জনগোষ্ঠীর সন্ধান মেলে, যারা দীর্ঘদিন কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে চলছিল এবং তাদের নামও জানা যায়নি।

অন্যদিকে, পেরুর গহিন বনের মাশকো পিরো গোষ্ঠী বিশ্বের সবচেয়ে বড় যোগাযোগহীন জনগোষ্ঠী, যাদের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৭৫০। ১৮০০ সালে আমাজনের রাবার খামারে দাস হিসেবে আটকে থাকা কিছু মানুষ পালিয়ে গহিন জঙ্গলে আশ্রয় নেয়; তারাই মাশকো পিরোদের পূর্বপুরুষ। জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী প্রতিটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই জনগোষ্ঠীগুলো সেই অধিকারই প্রয়োগ করে—যখন ইচ্ছা হয় তখন বাইরের সঙ্গে দেখা করে, আর পছন্দ না হলে দূরে সরে থাকে। তাদের কাছে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা নেই এমন ভাবনা ভুল; তারা সচেতনভাবেই বিচ্ছিন্নতা বেছে নিয়েছে।