সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি প্রচারিত একটি ফটোকার্ডে নোয়াখালী জেলা কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের একজন কর্মীর জিপিএ-৫ অর্জনের কথা বলা হয়েছে। ফটোকার্ডটিতে এক ব্যক্তির ছবি এবং কারাগারের ফটকের ছবি ব্যবহার করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী এ+ পেয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।’ আরও বলা হয়, ‘জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেলেন ছাত্রলীগ কর্মী জোনায়েদ’ এবং নোয়াখালী কারাগারে বন্দী থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি এই ফলাফল করেছেন। কিছু পোস্টে আবার এসএসসি পরীক্ষার উল্লেখও রয়েছে এবং ১১ আগস্ট ফটোকার্ডটি প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে প্রথমেই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময়সূচি পর্যালোচনা করা হয়। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল ১০ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ছাড়া অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে বন্যার কারণে স্থগিত হওয়া চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষাগুলো এখনো চলমান রয়েছে। ফলে চলতি বছরে নোয়াখালী জেলা কারাগারে বন্দী থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পাওয়ার তথ্যটি বাস্তবসম্মত নয়, কারণ সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাই এখনো সম্পন্ন হয়নি এবং ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি।

এরপর ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবির উৎস যাচাই করা হয়। ছবিটিতে নোয়াখালী জেলা কারাগারের ফটকের দুই পাশের পিলারে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখা থাকলেও ‘শুভ’ শব্দটি বিকৃত ও অস্পষ্ট এবং এর নিচের লেখাগুলোও অস্বাভাবিকভাবে ম্লান ও অসংলগ্ন। এই ধরনের ত্রুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবির সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হলে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে একই পটভূমির ছবি পাওয়া যায়। সেসব ছবিতে কারাগারের ফটকে ‘১৪৩২ বাংলা, শুভ নববর্ষের প্রীতি ও শুভেচ্ছা, নোয়াখালী জেলা কারাগার’—এই লেখাটি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ফটোকার্ডের পটভূমি ছবিটি সম্পাদিত বা পরিবর্তিত রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও গভীর যাচাইয়ে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী দুটি সরঞ্জাম—Sightengine এবং Hive Moderation—ব্যবহার করে ছবিটি বিশ্লেষণ করা হয়। উভয় টুলের ফলাফলেই ছবিটিকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়। সুতরাং, ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ব্যক্তির ছবি ও কারাগারের পটভূমি—উভয়ই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্মিত বা সম্পাদিত।

অন্যদিকে, নোয়াখালী জেলা কারাগার থেকে চলতি বছরের এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন কি না, তা জানতে প্রাসঙ্গিক কীওয়ার্ডে অনুসন্ধান চালানো হয়। এতে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল প্রকাশিত একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যেখানে উল্লেখ আছে যে নোয়াখালী জেলা কারাগার থেকে এসএসসি পরীক্ষায় মাহবুব এলাহী রাজিন নামের এক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। সে নোয়ান্নই উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র। কারাগারের অভ্যন্তরে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে তার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল।

এই বিষয়ে নোয়াখালী জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক আ. বারেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় নোয়াখালী কারাগার থেকে দুজন হাজতি—একজন নিয়মিত ও একজন অনিয়মিত—পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তবে এইচএসসি পরীক্ষায় কারাগার থেকে কোনো আসামি অংশগ্রহণ করেননি। ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর মাহবুব এলাহী রাজিনের ফলাফল সম্পর্কেও অনুসন্ধান করা হয়। তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নোয়ান্নই উচ্চবিদ্যালয়ের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ফলাফলের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২২৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে ১১২ জন কৃতকার্য হয়েছে। সেখানে ছবি ও নামসহ নয়জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে—যাদের মধ্যে ছয়জন ছাত্রী ও তিনজন ছাত্র। এই তিনজন ছাত্রের নাম ও ছবি যাচাই করেও প্রচারিত ফটোকার্ডের ‘জোনায়েদ’ নামের সঙ্গে বা ছবির সঙ্গে কারও মিল পাওয়া যায়নি।

পরিশেষে, নোয়ান্নই উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পষ্ট করেন, মাহবুব এলাহী নামের একজন শিক্ষার্থী কারাগারে থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তিনি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং এবারের পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। অর্থাৎ, কারাগার থেকে পরীক্ষা দেওয়া শিক্ষার্থীর নাম জোনায়েদ নয়, বরং মাহবুব এলাহী; এবং তিনি জিপিএ-৫ পাননি, বরং একটি বিষয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। একই সঙ্গে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।

সুতরাং, ‘কারাগার থেকে পরীক্ষা দিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী জোনায়েদ জিপিএ-৫ পেয়েছেন’—এই দাবিটি কোনো বাস্তব ভিত্তি রাখে না। প্রকৃত শিক্ষার্থীর নাম মাহবুব এলাহী, যিনি পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলও এখনো প্রকাশিত হয়নি। পাশাপাশি ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবিটিও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত বলে যাচাইয়ে প্রমাণিত হয়েছে।