১৯৮৬ সালের ১৬ আগস্ট। ইংল্যান্ডের ক্যাসল ডনিংটনে অনুষ্ঠিত ‘মনস্টারস অব রক’ উৎসবে ডেফ লেপার্ডের সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন রিক অ্যালেন। বাঁ হাত হারানোর প্রায় ২০ মাস পর এটাই ছিল ব্যান্ডের সঙ্গে তাঁর প্রথম বড় সরাসরি পরিবেশনা। আজ সেই ঐতিহাসিক দিনের ৪০ বছর পূর্ণ হলো।

ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৪ সালের শেষ রাতে। নতুন বছরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ২১ বছর বয়সী অ্যালেন শহরের বাইরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বান্ধবী মিরিয়াম বারেন্ডসেন। দ্রুতগতিতে অন্য একটি গাড়িকে পাশ কাটাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গাড়ি থেকে ছিটকে পড়েন অ্যালেন; তাঁর বাঁ হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রথমে চিকিৎসকরা হাতটি পুনরায় শরীরের সঙ্গে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সংক্রমণের কারণে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে বাঁ হাতটি চিরতরে হারাতে হয় তাঁকে। একজন ড্রামারের জন্য দুই হাতের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল—অ্যালেন কি আর কখনো ড্রাম বাজাতে পারবেন? তাঁর সংগীতজীবন কি সেখানেই শেষ?

তখন ডেফ লেপার্ডের ক্যারিয়ারও গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তৃতীয় অ্যালবাম ‘পাইরোম্যানিয়া’ দারুণ সফল হয়েছিল; বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে ব্যান্ডটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এমন সময়ে দলের ড্রামারের এই দুর্ঘটনা ছিল বড় ধাক্কা। প্রধান গায়ক জো এলিয়টও শুরুতে মনে করেছিলেন, অ্যালেনের ড্রাম বাজানোর ক্যারিয়ার বুঝি এখানেই শেষ।

কিন্তু অ্যালেন ভিন্ন পথ বেছে নেন। দুর্ঘটনার পরও তিনি ব্যান্ড ছাড়তে বা ড্রাম থেকে দূরে সরে আসতে রাজি হননি। বরং এক হাত নিয়ে আবার বাদ্যযন্ত্রটি বাজানো শেখার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় একটি ড্রাম কিট; যেখানে কিছু শব্দ ও অংশ পায়ের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। ফলে এক হাত ও দুই পায়ের সমন্বয়ে নতুন কৌশল রপ্ত করতে শুরু করেন তিনি। বাজানোর ধরনও পুরোপুরি বদলে ফেলেন—পরিচিত ড্রাম ফিল ও কৌশল নতুনভাবে সাজান।

এই লড়াইয়ে ব্যান্ডের সদস্য, পরিবার ও ভক্তরা তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছেন। পরবর্তীকালে অ্যালেন নিজেই জানিয়েছেন, কখনো তাঁর মনে হতো তিনি আর পারবেন না, নিজেকে পরাজিত মনে হতো। কিন্তু আশপাশের মানুষের সমর্থন ও নিজের জেদ তাঁকে আবার দাঁড়াতে সাহায্য করে।

প্রায় ২০ মাস পর আসে সেই প্রত্যাশিত দিন। ১৯৮৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘মনস্টারস অব রক’ উৎসবে তিনি আবার মঞ্চে ফেরেন। সেদিনের পরিবেশনা শুধু একজন ড্রামারের প্রত্যাবর্তন ছিল না; কয়েক মাস আগেও যাঁর সংগীতজীবন শেষ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি নতুনভাবে নিজের অবস্থান ফিরে পান। বিশেষ ড্রাম কিট ও বদলে যাওয়া কৌশল নিয়ে আবার ডেফ লেপার্ডের ছন্দের দায়িত্ব নেন অ্যালেন।

পরবর্তী সময়ে ব্যান্ডটির সাফল্যের আরও বড় অধ্যায়ের অংশ হন তিনি। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ‘হিস্টেরিয়া’ অ্যালবামটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়; বিক্রি ছাড়ায় এক কোটি কপি। অ্যালবামটিতে ‘পাওয়ার সাম সুগার অন মি’ ও ‘লাভ বাইটস’সহ একাধিক জনপ্রিয় গান ছিল। বিশ্বজুড়ে ডেফ লেপার্ডের রেকর্ড বিক্রি ১০ কোটির বেশি। ২০১৯ সালে ব্যান্ডটি ‘রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম’–এ স্থান পায়।

১৯৬৩ সালে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন রিক অ্যালেন। কিশোর বয়সেই ডেফ লেপার্ডে যোগ দেন। চার দশকের বেশি সময় ধরে দলের সঙ্গে ড্রাম বাজিয়ে চলেছেন তিনি। রক সংগীতের ইতিহাসে তাঁর নামটি বিশেষভাবে স্মরণীয়—এক হাত হারিয়েও ড্রামার হিসেবে হাল না ছাড়া ও নতুনভাবে মঞ্চে ফিরে আসার সেই অনন্য গল্পের জন্য।

আজ থেকে চার দশক আগে, ১৯৮৬ সালের এই দিনে অ্যালেন প্রমাণ করেছিলেন—শরীরের একটি অঙ্গ হারালেও সব স্বপ্ন নিঃশেষ হয়ে যায় না। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু সংগীতজগতের নয়, মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। প্রতিবেদনটি আমেরিকান সংরাইটার ডটকম অবলম্বনে প্রস্তুত।