দেশে নিত্যপণ্য আমদানির প্রতিযোগিতায় গত কয়েক অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষস্থানে থাকা সিটি গ্রুপ এখন পিছিয়ে পড়ছে, আর নতুন করে সামনে এসেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে টানা তৃতীয়বারের মতো নিত্যপণ্য আমদানিতে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে এমজিআই। প্রতিষ্ঠানটি গত অর্থবছরে ১৫১ কোটি ডলার ব্যয় করে প্রায় ৩৩ লাখ টন নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি। মোট সাতটি পণ্যশ্রেণির আমদানি ব্যয়ের ২২ শতাংশই ছিল এমজিআইয়ের। এছাড়া আমদানি করে সরকারকে তিন হাজার ৩৯১ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছে গ্রুপটি। চিনি ও সয়াবিন বীজ আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে এমজিআই; ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য পণ্যেও প্রতিষ্ঠানটির বড় অংশীদারত্ব রয়েছে।
অন্যদিকে, একসময় নিত্যপণ্য আমদানিতে নেতৃত্ব দেওয়া সিটি গ্রুপ বর্তমানে বড় ধরনের পতনের মুখে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৫৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে দ্বিতীয় স্থান থেকে চতুর্থ স্থানে নেমে গেছে তারা। ব্যাংকঋণ পরিশোধ ও অর্থায়নের চাপকে এই পতনের কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে সিটি গ্রুপের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমজিআই ও সিটি গ্রুপের আমদানির ব্যবধান এখন অনেক বড়; সিটির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি অর্থের পণ্য আমদানি করেছে এমজিআই।
এই তালিকায় এক ধাপ এগিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠেছে টি কে গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি ৭৯ কোটি ডলার ব্যয় করে প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য আমদানি করেছে, যা মোট আমদানি ব্যয়ের ১১ শতাংশের বেশি। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে টি কে গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার জানান, দেশের নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ায় আমদানি বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে স্মাইল ফুড প্রোডাক্টস। আবুল খায়ের গ্রুপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি ৭০ কোটি ডলার ব্যয় করে ৮ লাখ ৪৪ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে। চিনি ও ভোজ্যতেল কারখানা কেনার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় তাদের কাঁচামাল আমদানি দ্রুত বাড়ছে।
পঞ্চম স্থানে টানা দ্বিতীয়বারের মতো অবস্থান ধরে রেখেছে রাজশাহীকেন্দ্রিক নাবিল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি ৪০ কোটি ডলারের ১২ লাখ ৯৩ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে গম, ছোলা, মসুর ডাল ও মটর ডাল প্রধান। গম আমদানিতে শীর্ষে রয়েছে নাবিল। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশে নিত্যপণ্যের সংকট এড়াতে ধারাবাহিকভাবে আমদানি অব্যাহত রাখা হচ্ছে এবং নতুন ফ্লাওয়ার মিল চালু হলে সরবরাহ আরও বাড়বে।
এবারের তালিকায় সবচেয়ে বড় উত্থান হয়েছে ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১৩তম স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এক বছরের ব্যবধানে সাত ধাপ এগিয়ে ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, যার মধ্যে গম, সয়াবিন বীজ ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল প্রধান। ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক জানান, নারায়ণগঞ্জে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানার উৎপাদন শুরু হওয়ায় আমদানি বেড়েছে।
শীর্ষ দশে উঠে এসেছে প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১২তম স্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এখন নবম স্থানে রয়েছে। নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতে বড় বিনিয়োগের কারণে কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে প্রাণ–আরএফএল ২১ কোটি ডলারের প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন পণ্য আমদানি করেছে। সপ্তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ এডিবল অয়েল (বিইওএল), যা মূলত ভোজ্যতেল আমদানি করে। অষ্টম স্থানে সরকারি খাদ্য বিভাগ, যারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৩ কোটি ডলারের ৭ লাখ ৬০ হাজার টন গম আমদানি করেছে। দশম স্থানে জহির গ্রুপ ১৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
সামগ্রিকভাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে সাত নিত্যপণ্যশ্রেণিতে ১ কোটি ৫৪ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ১৬ শতাংশ, কিন্তু খরচ বেড়েছে মাত্র ৩ শতাংশের কম। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম কমায় এই তারতম্য হয়েছে বলে মনে করছেন আমদানিকারকেরা। উল্লেখ্য, এসব নিত্যপণ্যের চাহিদার মাত্র ১১ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, বাকি ৮৯ শতাংশ আসে আমদানি থেকে। ফলে বড় আমদানিকারকদের অবস্থান দেশের বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অর্থবছরে এস আলম গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের নামে কোনো নতুন চালান খালাসের তথ্য পাওয়া যায়নি, যা পুরোনো সমীকরণ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।




