মাত্র ১২ কোটি টাকা বাজেটের একটি হরর চলচ্চিত্র এখন পর্যন্ত আয় করেছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার বেশি। এই অসাধারণ সাফল্যের মালিক ক্যারি বার্কার পরিচালিত 'অবসেশন'। স্বল্পবাজেটের এই ছবিটি দর্শক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ইউটিউবার থেকে পরিচালকে পরিণত হওয়া ক্যারি বার্কার 'মিল্ক অ্যান্ড সিরিয়াল' নামক স্বল্প বাজেটের হরর ছবি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও 'অবসেশন' তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র বেয়ার (মাইকেল জনস্টন) বাদ্যযন্ত্রের দোকানের এক অন্তর্মুখী তরুণ কর্মচারী। সে তার সহকর্মী নিকিকে (ইন্দে নাভারেটে) গভীরভাবে ভালোবাসে কিন্তু সেই কথা প্রকাশ করতে পারে না। তাদের কমন বন্ধু ইয়ান (কুপার টমলিনসন) ও সারা (মেগান ললেস) রয়েছে এই জটিল সম্পর্কের গোলকধাঁধায়। একতরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা নিয়ে দিবস কাটে বেয়ারের। মজার বিষয় হলো, সারা নিজেও গোপনে বেয়ারকে ভালোবাসে, কিন্তু সেটাও অপ্রকাশিত থেকে যায়।
একদিন নিকির হারিয়ে যাওয়া নেকলেসের বদলে উপহার কিনতে গিয়ে বেয়ার আবিষ্কার করে এক অদ্ভুত জিনিস। 'ওয়ান উইশ উইলো' নামের একটি কাঠির মতো বস্তু, মাঝখান থেকে যা ভাঙলে ইচ্ছা পূরণ হয়—দাম মাত্র ৬ ডলার ৯৯ সেন্ট। প্রথমে নিকিকে এটি উপহার দেওয়ার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত নিজেই ব্যবহার করে বেয়ার। সে ইচ্ছা করে, নিকি যেন পৃথিবীর যেকোনো মানুষের চেয়ে তাকে বেশি ভালোবাসে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই ইচ্ছা সত্যি হয় এবং মুহূর্তেই নিকির ব্যক্তিত্ব বদলে যায়। প্রথমদিকে নিকির এই তুমুল প্রেম উপভোগ করে বেয়ার, কিন্তু শীঘ্রই বুঝতে পারে এই সম্পর্কের একটি ভয়ংকর অন্ধকার দিক রয়েছে।
পরিচালক বেয়ারকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বা ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেননি, বরং সে নিজেও এই বিপর্যয়ের অংশীদার। কারণ সে জানে নিকির ভালোবাসা স্বাভাবিক নয়, তবু প্রথম দিকে তা উপভোগ করে। চরিত্রটিকে অতিরিক্ত আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা না করে বরং প্রয়োজনীয় জায়গায় তাকে দুর্বল ও অসহায় হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবির আসল প্রাণ নিকি তথা ইন্দে নাভারেটের অভিনয় সত্যিই অসাধারণ। জাদুর প্রভাবে বদলে যাওয়া নিকির তীব্র উপস্থিতি যেমন দর্শকের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়, তেমনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলে তার অসহায়ত্বের জন্য গভীর সহানুভূতি জাগে।
শুধু চমকের উপর নির্ভর না করে ধীরে ধীরে উত্তেজনা তৈরি করার কৌশল বার্কার ভালোভাবে আয়ত্ত করেছেন। রক বারওয়েলের আবহসংগীত এই উত্তেজনাকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও কোথাও কোথাও এই ধীরগতি একটু বেশি দীর্ঘ মনে হতে পারে। প্রায় ১১০ মিনিটের ছবিটি আরও সংক্ষিপ্ত হলে টানটান ভাব বজায় থাকত। বিশেষ করে একটি আকস্মিক সহিংস আক্রমণের দৃশ্য এতটাই অপ্রত্যাশিত যে দর্শক হতভম্ব হয়ে যায়। বিড়ালপ্রেমীদের জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে—এমন কিছু মুহূর্ত আছে যা দেখে নিজের পোষা প্রাণীর খোঁজ নিতে মন চাইবে। এছাড়া নির্মম পিটিয়ে হত্যার একটি দৃশ্যের নৃশংসতা এত বেশি ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রে এনসি-১৭ রেটিং এড়াতে সেটির কিছু অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে।
ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নিকির উপর চালানো যৌন ও মানসিক সহিংসতার বিষয়টি যথাযথভাবে অনুসন্ধান না করা। গল্পটি এমন এক পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে যে নিকিকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয় বরং জিতে নেওয়ার একটি পুরস্কার হিসেবে দেখে। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে ছবিটি নিকির দুর্ভোগকে আড়াল করে দেওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। সংলাপনির্ভর ও মূলত ঘরোয়া পরিবেশে আবদ্ধ 'অবসেশন'-এর গল্প শুরু হয় একতরফা প্রেমকে কেন্দ্র করে। জাদুর ছোঁয়ায় সেটি পরিণত হয় এক দুঃস্বপ্নের সম্পর্কে। শুরুতে ছবিটি যেন অদ্ভুত এক রোমান্টিক কমেডি হলেও একসময় হঠাৎই স্ল্যাশার হররের পথে মোড় নেয়। সেই মোড় বার্কার এত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন যে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। এ কারণেই সারা দুনিয়ার হররপ্রেমীরা এই সিনেমাটিকে এত ভালোবেসেছেন। সম্প্রতি এটি অ্যাপল টিভি+-এ স্ট্রিমিং করছে।




