দীর্ঘ এক দশকের জটিলতা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নির্মাণের পথে এগোলো চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল। গত সোমবার প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো অবকাঠামো নির্মাণের কাজ। তবে প্রকল্পের নির্ধারিত বাস্তবায়নকাল শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে, আর অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্য ২০৩১ সালের ডিসেম্বর।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যানুযায়ী, এই প্রকল্পে মোট ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আসতে পারে, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখেরও বেশি মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। নতুন এই শিল্পাঞ্চলের অবস্থানই এর সবচেয়ে বড় শক্তি। এটি চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মাঝামাঝি এক কৌশলগত স্থানে অবস্থিত। ভবিষ্যতে বাঁশখালী ও পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত সড়ক নির্মিত হলে পুরো অঞ্চলটি একটি সমন্বিত শিল্প পরিবহন বলয়ে রূপ নেবে।

তবে কেবল ভৌগোলিক নৈকট্যই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সেবার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগসেবা কত দ্রুত নিশ্চিত করা যায় তার ওপর।

এই শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের পথটা মোটেই মসৃণ ছিল না। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরে এই উদ্যোগের ব্যাপারে প্রাথমিক সমঝোতা হয়। কিন্তু ডেভেলপার নির্বাচন, অর্থায়ন এবং চুক্তির শর্ত নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানার ফলে প্রকল্পটি থমকে ছিল। প্রথম দিকে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সে প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে চীন সরকার নতুন করে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) মনোনীত করে। এর ধারাবাহিকতায় গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সিআরবিসির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের বিস্তারিত: এই প্রকল্পের আওতায় উল্লেখযোগ্য কিছু অবকাঠামো নির্মিত হবে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন সক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর উপযোগী একটি বহুমুখী জেটি। জেটির সাথে যুক্ত হবে ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ একটি সংযোগ সড়ক, একটি সেতু এবং আরও একটি চার লেনের সড়ক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিদিন ২ কোটি ৫০ লাখ লিটার তরল বর্জ্য শোধন করতে পারবে এমন একটি কেন্দ্রীয় শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, গ্যাস সঞ্চালন লাইন, দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, পানি সংরক্ষণাগার এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে।

এর আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) শিল্পাঞ্চলটির সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে। এই অর্থের মধ্যে সরকার এক হাজার ৭২২ কোটি টাকা জোগান দেবে, বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বিদেশি ঋণ হিসেবে। বেজা আগামী তিন বছরের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৬০ শতাংশ প্লট কারখানা নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ শিল্পাঞ্চলে চূড়ান্তভাবে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব কেবল আনোয়ারা নয়, পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম জুড়ে বিস্তৃত হবে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক মত প্রকাশ করে বলেন, বন্দরের সন্নিকটে অবস্থান সবচেয়ে বড় সুবিধা। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্যাস-অনাবশ্যক শিল্পে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি সময়মতো অবকাঠামো নির্মাণ ও সেবা নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চল চট্টগ্রাম বন্দর, টানেল ও মাতারবাড়ী বন্দরের মিতালিতে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য শিল্প করিডরের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে।