আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব যদি সরকার এবং ব্যবসায়ী মহল মিলেমিশে কাজ করে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওস্থিত তাঁর কার্যালয়ে বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা জানান।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজিত এই সভায় প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বর্তমান সংকট দ্রুত নিরসনে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আরেক দফা বৈঠকের আশ্বাস প্রদান করেন। প্রেস উইং থেকে প্রেরিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি মন্তব্য করেন, 'দেশের অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, যত বেশি আলোচনা করা যাবে, তত ভালোভাবে সমস্যা শনাক্ত করা যাবে এবং সেগুলোর কার্যকরী সমাধান বের করে আনা সম্ভব হবে।
নিজের মন্ত্রিসভার বয়স এখনও ছয় মাস পূর্ণ হয়নি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই ব্যবধানে উদ্যোক্তাদের সাথে একাধিক বৈঠক হয়ে গেল। গত ৪ এপ্রিলের প্রথম বৈঠকে যেসব প্রতিবন্ধকতার কথা উঠে এসেছিল, তার উল্লেখযোগ্য অংশের ইতোমধ্যে সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। বিডার সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, সেই বৈঠকে চিহ্নিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টির বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে; বাকি সাতটি সমস্যা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরসহ একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এবং বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান উপস্থিতি ছিলেন।
শীর্ষ স্থানীয় শিল্প গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও এই মতবিনিময়ে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সিইও, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান, এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইনসেপ্টা গ্রুপের চেয়ারম্যান, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান, ওয়ালটনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিবিএল গ্রুপ ও প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের কর্ণধাররা অন্যতম।
বৈঠক সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের চলমান সংকট নিয়ে উদ্যোক্তারা তাদের উদ্বেগ ব্যক্ত করেন। জবাবে সরকার পক্ষ থেকে ব্যাখা দেওয়া হয়, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউয়ের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চালানোর ফলে সাময়িক এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আশ্বস্ত করেন যে, রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম সমাপ্ত হতে মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময়ের প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে তৃতীয় একটি এফএসআরইউ অনুমোদনের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের কাজও শুরু হয়েছে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনবে বলে গণ্যা করা হচ্ছে।
এছাড়াও সম্মেলনে ২০৩০ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার একটি প্রাথমিক খসড়া ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হয়, যার বাস্তবায়নে কূটনীতিক অঙ্গনের সহায়তার আশ্বাস দেয় সরকার। পাশাপাশি, ছোট ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) সরাসরি রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমিত পুঁজি ও সক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করে বড় রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ' হিসেবে তাদের পণ্য ব্যবহারের প্রস্তাব সামনে আসে। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় শুল্ক সুবিধার প্রসঙ্গসহ একটি নীতিমালা প্রণয়নে বিডার নেতৃত্বে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। উদ্যোক্তারা বিএসটিআইয়ের বাইরে বেসরকারী পরীক্ষাগার নির্মাণের দাবিও উত্থাপন করেন।
সভা শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিনিয়োগকাীদের জটিলতা সমাধানে সরকার কতটা আন্তরিক তা এ বৈঠকের মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে আশ্বস্ত বোধ করছেন এবং ভবিষ্যতে এই ধারাবাহিক সংলাপ অব্যাহত থাকবে।




