বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম আকরাম খান। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের মাধ্যমে দেশকে বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে তুলে ধরার কৃতিত্ব তাঁর নেতৃত্বেই। পরের বছর হায়দরাবাদে কেনিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়টিও ছিল তাঁর হাত ধরে। আট টেস্ট ও ৪৪ ওয়ানডে খেলা এই কিংবদন্তি খেলোয়াড় অবসরের পরও ক্রিকেটের সঙ্গেই যুক্ত থেকেছেন—নির্বাচক, প্রধান নির্বাচক এবং বোর্ড পরিচালকের ভূমিকায়। তারেক মাহমুদের সাক্ষাৎকারে ব্যক্তি আকরাম খানের জীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে।

শুরুটা হয়েছিল খেলার প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে। তাঁর ভাষ্য, "প্রেমের আগে তো আমার জীবনে ক্রিকেট এসেছে।" তাঁর প্রজন্মের কাছে মাঠ আর পড়াশোনাই ছিল মূল ব্যস্ততা। বড় ভাই ইকবাল খানের (জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার নাফিস ইকবাল ও তামিম ইকবালের বাবা) ফুটবল খেলার কারণে বাসায় নিয়মিত আসতেন দেশের সেরা ফুটবলাররা, যা পরিবারের খেলাপাগল মনোভাব আরও বাড়িয়ে দেয়। আকরাম নিজেও ফুটবল ও ক্রিকেট দুটোই খেলতেন।

তবে তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট আসে আবাহনী ক্লাবে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে। ফুটবলার আশীষ ভদ্রের পরামর্শে তিনি আবাহনীতে যান, যেখানে তাঁর সাথে পরিচয় হয় মামুন, তামিম ও ফয়েজের মতো মানুষদের। এই ক্লাবেই তিনি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ঢাকা লিগে খেলতে গিয়ে প্রথম দিকে একাকীত্ব আর খাওয়ার সমস্যায় তিনি কেঁদেছেন বলেও স্বীকার করেন। তবে খেলার প্রতি তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা কখনও দুর্বল হয়নি।

আকরাম খানের শারীরিক গঠন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ক্লাস সেভেনের পর থেকেই তিনি ওভারওয়েট। চট্টগ্রামের পারিবারিক রীতি অনুযায়ী বাসায় প্রচুর গরুর মাংস, বিরিয়ানি, পরোটা—এইসব রিচ ফুড খাওয়ার অভ্যাস ছিল। তবে তিনি ফুটবল খেলে নিজের ফিটনেস ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর লম্বা দৌড়ে সমস্যা থাকলেও স্প্রিন্টে ছিলেন দারুণ। ফুটবলার হতে চাইলেও মোটা হওয়ার কারণে লজ্জায় প্রথম বিভাগে খেলতে যাননি তিনি। পরে ক্রিকেটকেই সিরিয়াসলি নেন এবং সাফল্য পান।

প্রেম ও বিয়ের প্রসঙ্গে আকরাম জানান, তাঁর স্ত্রী সাবিনা ছিলেন প্রতিবেশী। বারান্দায় বসে তিনি প্র্যাকটিস করতেন, আর সাবিনা নিজেদের বারান্দা থেকে তা দেখতেন। পরে ঢাকায় খেলতে এসে তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্ত্রীর পরামর্শ তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দেন এবং তাঁর জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাবিনার ভূমিকা ছিল। স্ত্রীই তাঁকে মাছ খাওয়া শেখান, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে উৎসাহ দেন এবং সন্তানদের শিক্ষার পরিকল্পনা করেন। আকরামের ভাষায়, "ভালো বউ পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার।"

অবসরের পর ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনে না দাঁড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, গত দেড় বছরে ক্রিকেটের পরিবেশ খারাপ হয়েছে এবং তিনি নিজেকে কিছু জায়গায় অপমানিত ও ছোট বোধ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর আসল পরিচয় একজন ক্রিকেটার হিসেবে, যা তিনি ধরে রাখতে চান।

বর্তমানে তিনি নিয়মিত হাঁটেন, জিম করেন এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে রাখেন। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, গান শোনা এবং নির্জনে বসে চিন্তা করাকে তিনি ভালোবাসেন। তাঁর রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ‘ক্রিকেটার্স কিচেন’ চালু রেখেছেন এবং চট্টগ্রামের পারিবারিক রেস্টুরেন্টও বন্ধ করেননি।