দীর্ঘ চার বছর ধরে তুলনামূলক নীরবতা বজায় রাখার পর ইয়েমেনে আবারও পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধের শঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশটির হুতি বিদ্রোহীরা পুনরায় সামরিক অভিযানে নেমেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২২ সালের এপ্রিলে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ফলে নতুন করে যুদ্ধ বাধলে হুতিরা আগের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

গত বুধবার হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার দায় স্বীকার করেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। তাদের দাবি, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ঘোষিত নৌ অবরোধ অমান্য করার জেরেই এই হামলা করা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দালে প্রদেশে হুতি যোদ্ধাদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ৩০ জনের বেশি হতাহত হয়েছে। এই দুই ঘটনা ইঙ্গিত করছে যে হুতিরা কেবল হুমকি নয়, বরং বাস্তব সামরিক পদক্ষেপও নিচ্ছে।

উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেন, রাজধানী সানা ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হুতিরা এখন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, বিশেষত সরকারি বাহিনীর ওপর আরও বড় সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। গত এক দশকে ইয়েমেন সরকার, সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখলের সময় সরকারপন্থীদের দুর্বল প্রতিরোধ ও অভ্যন্তরীণ বিভেদ কাজে লাগিয়ে তারা দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আত্মবিশ্বাস বিভ্রান্তিকর হতে পারে। গত চার বছরে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুতিবিরোধী সরকারপন্থী বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি আল-জাজিরাকে বলেন, প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কমে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সমন্বিত হয়েছে। সৌদি আরব এখন হুতিবিরোধী পক্ষগুলোকে একত্রে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করছে, যার ফলে ইয়েমেন সরকার আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ওয়াশিংটন সেন্টার ফর ইয়েমেনি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক মারওয়ান আলী নোমানের মতে, রাজধানী সানার পূর্বে আল-জাওফ প্রদেশে হুতিবিরোধী একটি নতুন উপজাতীয় জোট গড়ে উঠেছে। গত জুনের শেষে হুতি নেতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া গোত্রীয় নেতা হামাদ আল-হাজমির ৫০ দিন আটক থাকার ঘটনা এই জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নোমান বলেন, সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও হুতিদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা ব্যবস্থাপক ইয়াজিদ আল-জেদ্দাওয়ি বলেন, হুতিরা যদি সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলা চালায়, তবে লোহিত সাগরের নৌপথ রক্ষায় নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুততর হতে পারে। কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। একই সঙ্গে সরকারপন্থী স্থলবাহিনীর প্রতিও আরও বেশি সমর্থন আসতে পারে, কারণ ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর তারা নিজেদের পুনর্গঠন ও অস্ত্র সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হুতিরা আবার সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালালে তাদের এবং ইরানকে ‘কঠোর সামরিক শাস্তির’ মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকেই দায়ী করবে, কারণ হুতিরা ইরানের মিত্র হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে হুতিরা ধারণা করছে যে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যেতে চাইবে না এবং তারা দ্রুত সমঝোতার পথ খুঁজবে।

গোত্রীয় নেতা হামাদ আল-হাজমি মুক্তি পাওয়ার পর নিজ এলাকায় ফিরে আটকের সময় তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরলে ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে হাজারো গোত্রীয় নেতা ও সদস্য আল-জাওফে জড়ো হয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে লেখক ফুয়াদ মুসসেদ আল-জাজিরাকে বলেন, দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ার পর এবারই প্রথম গোত্রগুলো এতটা ঐক্যবদ্ধভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, আল-জাওফের এই হুতিবিরোধী গোত্রীয় জোট সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে।

তবে সানা সেন্টারের ইয়াজিদ আল-জেদ্দাওয়ি সতর্ক করে বলেন, এই জোট কতটা বিস্তৃত ও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং সরকারি বাহিনীর সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে পারে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের শুরুর দিকের যুদ্ধের পর হুতিরা এ ধরনের চ্যালেঞ্জ আর মোকাবিলা করেনি। সে সময় তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর অনুগত সেনা ইউনিট ও সামরিক কর্মকর্তাদের সমর্থন পেয়েছিল। সানার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের বাহিনীতে বর্তমানে দুই লাখের বেশি যোদ্ধা রয়েছে এবং প্রয়োজনে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা থেকে আরও কয়েক হাজার সমর্থককে যুদ্ধে নামানো সম্ভব।

আল-জেদ্দাওয়ির মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পরিস্থিতি সরকারপন্থীদের অনুকূলে গেলেও ইয়েমেনের ক্ষমতার ভারসাম্যে এখনো কোনো নির্ণায়ক পরিবর্তন আসেনি। সেটি নির্ভর করবে সরকার ও হুতিবিরোধী বাহিনীগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, বিভিন্ন রণাঙ্গনে কতটা সমন্বয় গড়ে তুলতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে আঞ্চলিক সমর্থন ধরে রাখতে পারে কি না, তার ওপর। তবে হুতিদের এখনো একক নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, শক্ত ঘাঁটি এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। আল-জেদ্দাওয়ি শেষে বলেন, হুতিবিরোধী বাহিনী ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির শুরুর সময়ের তুলনায় এখন অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, কিন্তু সেই অগ্রগতিকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো কৌশলগত সাফল্যে রূপ দেওয়া এখনো নিশ্চিত নয়।