ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস গাজায় অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উচ্ছ্বাস জানালেও, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে ইসরায়েলের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনীহা। গত বৃহস্পতিবার সম্পাদিত নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলকে গাজা উপত্যকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ধাপে ধাপে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ইসরায়েলি রাজনৈতিক অঙ্গন ও সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েল সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির বিষয়ে মুখ না খুললেও, এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা গোপনীয়তার শর্তে শুক্রবার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হামাসের ‘প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ’ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে কোনো বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েল অত্যন্ত সন্তুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ কেবল নেতানিয়াহু নন, ইসরায়েলের নেতৃত্ব-প্রত্যাশী অন্য রাজনীতিবিদদের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসরায়েল যদি নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে, তবে ট্রাম্প ‘খুব, খুব হতাশ’ হবেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর থেকে ইসরায়েলের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী গাজার ফিলিস্তিনীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে অবস্থান করছে। ইসরায়েলি বাহিনীর জবাবী অভিযান, যেটিকে অনেক মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তাতে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। নিহতদের সিংহভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া, গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। গত মে মাসের এক জরিপের তথ্য বলছে, ৮২ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি গাজার বাসিন্দাদের বলপূর্বক উচ্ছেদের পক্ষে এবং ৬৪ শতাংশের ধারণা, গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ‘কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি নেই’। ফলে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার ও এলাকাটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ ইসরায়েলি সাধারণ জনগোষ্টির কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

চুক্তি ঘোষণার পর ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ অভিহিত করে বলেছেন, হামাসকে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অর্থ হবে হামলার সম্মতি। তার মতে, ফিলিস্তিনীদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করে ইসরায়েলকে গাজায় জয়ী হতে হবে। একই সুরে, সাবেক সেনাপ্রধান ও নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট বলেছেন, ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী হামাসের সম্পূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা ধ্বংসের আগে কোনো চুক্তি হবে ‘পূর্ণ ব্যর্থতা’। তিনি যোগ করেন, হামাস ইতিমধ্যেই যুদ্ধপূর্ব সংখ্যার সমান সদস্য পুনর্গঠন করেছে।

মার্কিন-ইসরায়েলি জনমত বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিনের মতে, সামনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতানিয়াহুর জন্য এ পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিরোধীদের দুর্নীতি মামলার মুখে থাকা এই নেতার বিচারিক জটিলতা এড়ানোর জন্য নির্বাচনে জয়ী হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। শেইন্ডলিনের বিশ্লেষণ, নেতানিয়াহুর কাছে জনগণের মানসিক আঘাত নয়, বরং জোটের শরিকদের ইচ্ছা ও ডানপন্থী ভোট ধরে রাখাই মুখ্য। তার ধারণা, নেতানিয়াহু গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা সরিয়ে নেবেন না, বরং কিছু প্রতীকী পরিবর্তন এনে ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখতে চাইবেন।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানের মত, নেতানিয়াহুর জন্য যেকোনো সরকার গঠনই এখন কঠিন। চুক্তিতে সম্মতি দিলে সেই পথ আরও দুর্গম হবে। চুক্তির সমালোচনা করলে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হবেন, আর ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য প্রয়োজনীয়—হয়তো ভোটের আগে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা অথবা সৌদি আরবের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মতো অর্জনের জন্য। তাই পরস্পরবিরোধী এই চাহিদাগুলো পরিচালনা করাই হবে তার মূল কৌশল।

ইসরায়েলি পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক নিমরোদ গোরেন মন্তব্য করেন, নেতানিয়াহু পূর্বেও এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন। তিনি ট্রাম্পকে চুক্তি ঘোষণা ও স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার সুযোগ দেবেন, কিন্তু প্রকৃত অর্থে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন না। গোরেনের ভাষায়, এটি নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শের সাথেই সংঘাতপূর্ণ, কারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য সীমান্তের বাইরেও উপস্থিতি অপরিহার্য। ধারণা করা হচ্ছে, ভোট যত এগিয়ে আসবে, নেতানিয়াহু সেনা প্রত্যাহারের বদলে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবেন।