বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির প্রতিটি উচ্চারণই বিশ্ববাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আর এখন সেই তথ্যের জন্য অর্থ দিতে হবে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন ট্রুথ সোশ্যাল আগামী শনিবার থেকে ‘ট্রুথ এপিআই’ নামে একটি বিশেষ সেবা চালু করতে যাচ্ছে, যা দিয়ে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ীরা তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট অন্যদের চেয়ে দ্রুত পেয়ে যাবেন। যদিও প্ল্যাটফর্মটির দাবি, এই তথ্য একইসাথে সর্বসাধারণের জন্যও প্রকাশ করা হবে।

এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের কোম্পানির জন্য বিপুল মুনাফার পথ তৈরি করলেও, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন এবং গোপন তথ্য ফাঁসের বিষয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অ্যাবল অ্যালফা ট্রেডিং-এর প্রধান ইরিন অলড্রিজ এই সেবাকে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “যদি কোনো পাবলিক কোম্পানির সিইও এমন করতেন, তাহলে সেটি সরাসরি জেলখানায় যাওয়ার মত অপরাধ হতো। কিন্তু এখানে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি নিজেই সব সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই সিদ্ধান্তগুলো আগাম একটি নির্বাচিত গোষ্ঠীর কাছে প্রকাশ করছেন।”

তবে ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি (টিএমটিজি) কর্পোরেশন এক বিবৃতিতে ডেমোক্রেটিক নেতাদের সমালোচনা করে বলেছে, তারা “মুক্তবাজারের প্রতি আদর্শিক বিরোধিতা কিংবা সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের পার্থক্য না বোঝার কারণে” এই সেবাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে। হোয়াইট হাউসর মুখপাত্রের দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সমস্ত প্রশ্ন টিএমটিজির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে।

একজন অত্যন্ত সক্রিয় ব্যবহারকারী হিসেবে ট্রাম্পের পোস্ট প্রায়শই শেয়ারবাজার, মুদ্রা এবং বন্ডের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। যেমন, চলতি মাসেই তিনি ট্রুথ সোশ্যালে কানাডার ওপর শুল্ক বৃদ্ধি, সৌদি আরবের সাথে পরমাণু চুক্তি বাতিল এবং ইরান যুদ্ধ বিস্তৃত করার মত হুমকি দিয়েছেন। এ ধরনের আগাম তথ্য জানা থাকলে উচ্চ গতির (হাই-ফ্রিকোয়েন্সি) ব্যবসায়ীরা কানাডিয়ান ডলার, তেলের ফিউচার বা শক্তির খাতের শেয়ারে বাজি ধরে বিশাল লাভ করতে পারেন। থেমিস ট্রেডিং-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জো স্যালুজি মনে করেন, “বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এটি একটি আবশ্যকীয় সেবা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ এটি বাজার চালিত কর এমন তথ্য।” তার ধারণা, প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠান এই সেবার জন্য অর্থ দিতে রাজি থাকতে পারে।

এছাড়া, ট্রাম্প ইদানীংকালে পাবলিক কোম্পানিগুলোর নাম উল্লেখ করে প্রশংসা করছেন, যা ওই সব শেয়ারের দর আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এপ্রিল মাসে ট্রাম্প প্যালান্টির টেকনোলজিসের স্টক সিম্বল উল্লেখ করলে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় শেয়ারটির দর বেড়েছিল। একই মাসের পরে ইন্টেলের প্রশংসা করায় তাৎক্ষণিকভাবে তার শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। সরকারি তদারকি সংস্থা ‘প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইট’-এর বিশেষজ্ঞ ডিলান হেডলার-গোডেট এই পরিস্থিতিকে ‘একটি জটিল জগাখিচুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, “স্পষ্টতই, ওয়াল স্ট্রিট নির্দিষ্ট কোম্পানির প্রশংসা কর আগাম জানতে চাইবে।”

ট্রাম্প মিডিয়ার ব্যবসার জন্য এই সেবাটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে কোম্পানির শেয়ারের দাম প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে, এবং কয়েকশ মিলিয়ন ডলার লোকসান গুনতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় মাসে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান যদি ১ লাখ ডলারের ফি প্রদান করে, তাহলে কোম্পানির বার্ষিক আয় দ্বিগুণ হতে পারে।

রাজনৈতিক বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা ও তদন্তের হুমকির মুখেও রয়েছে এই উদ্যোগ। ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্রেটিক সেনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন শুক্রবার এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন, “আমরা এই উন্মুক্ত দুর্বাচারের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি করতে বাধ্য করব।” এদিকে, ট্রাম্পের বিষয়ের সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, কোম্পানি লোকসান বাড়তে থাকলে প্রেসিডেন্ট তার প্ল্যাটফর্মটিকে নীতি ঘোষণার মূল মাধ্যম হিসেবে আরও জোরালোভাবে ব্যবহার করবেন। পাবলিক সিটিজেন সংগঠনের লবিষ্ট ক্রেইগ হলম্যান মন্তব্য করেছেন, “ট্রাম্প ভালোই জানেন কীভাবে পণ্য বিক্রি করতে হয়।”