কক্সবাজারে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় প্রকাশ পেল বিচারব্যবস্থার এক গুরুতর গলদ। মাদক মামলার প্রকৃত আসামি নিজের পরিচয় গোপন করে নিরপরাধ এক দিনমজুরের নাম ব্যবহার করে আদালতের রায় এড়িয়ে গেছে, আর সেই নিরপরাধ ব্যক্তিই এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে বন্দী। ঘটনাটি কক্সবাজার সদর থানা এলাকার। গত মঙ্গলবার থানা-পুলিশ এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানায়।

মামলার এজাহার ও পুলিশি তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২ মার্চ কক্সবাজার সদর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ওই সময় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দ্বিতীয় আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয় ‘সোনা মিয়া’ নামে, যার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ এবং ঠিকানা কুতুবদিয়াপাড়া ও গর্জনিয়া, রামু। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, তৎকালীন ডিবি পরিদর্শক মানস বড়ুয়া আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, দ্বিতীয় আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি। তবুও তার নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এই তদন্ত কর্মকর্তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। পলাতক সোনা মিয়ার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাও জারি করা হয়। এরপরই র‌্যাব-১৫ রামু এলাকা থেকে সোনা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাগারে প্রবেশের পরই গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তি আদালতে আবেদন করে জানান, তিনি এই মামলার আসামি নন এবং ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কখনো কারাগারেও যাননি। আদালত তার অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয়।

কক্সবাজার সদর থানা-পুলিশের তদন্তে ঘটনার আসল রহস্য উন্মোচিত হয়। গত ৫ জুলাই আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম মো. রমজান এবং тогда তার বয়স ছিল ২৫ বছর। অপরদিকে প্রকৃত সোনা মিয়ার বয়স ৩৪ বছর। রমজানই নিজেকে সোনা মিয়া বলে পরিচয় দিয়ে নকল জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করেছিলেন। তদন্তে জানা যায়, রমজান ও সোনা মিয়া একসময় রোহিঙ্গা শিবিরে এবং পরবর্তীতে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একই ঘরে বসবাস করতেন। সেই সূত্রে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য জানতে পেরে তা ব্যবহার করেন রমজান।

পুলিশের তদন্তে দুই ব্যক্তির শারীরিক ও পারিবারিক তথ্যে ব্যাপক অমিল পাওয়া গেছে। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ভুয়া সোনা মিয়ার পিতার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম ও স্ত্রীর নাম আয়েশা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তার উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি এবং দুই গাল ও ডান বাহুতে ক্ষতচিহ্নের বর্ণনা ছিল। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া প্রকৃত সোনা মিয়ার পিতার নাম একই (মৃত নজির আহমদ) হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি ও ওজন ৪২ কেজি। তার শরীরে ডান বাহু, পেটের বাঁ পাশে ও পিঠের মাঝখানে তিল থাকার উল্লেখ রয়েছে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. আলী সম্প্রতি জেলা কারাগারে গিয়ে আগে ও পরে গ্রেপ্তার হওয়া দুই সোনা মিয়ার সংরক্ষিত ছবি, শনাক্তকরণ চিহ্ন ও আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করে কোনো মিল পাননি। একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আরেক আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বর্তমান সোনা মিয়াকে তিনি চেনেন না। তদন্তে আরও উঠে আসে, বর্তমান সোনা মিয়া আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি বা কারাগারে ছিলেন না।

এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মন্নান বলেন, তদন্ত থেকে শুরু করে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তার চরম গাফিলতি রয়েছে। অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন যাচাই না করেই অভিযোগপত্র দেওয়ায় প্রকৃত অপরাধী রমজান পালিয়ে গেছে এবং নিরপরাধ সোনা মিয়া কারাগারে বন্দী হয়েছে, যা অমানবিক। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

কারাগারে থাকা সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তার স্বামী একজন খেটে খাওয়া মানুষ, কোনো অপরাধ করেননি। রমজান নামের এক রোহিঙ্গার সাথে তার স্বামীর পরিচয় ছিল, সেই রমজানের অপরাধের খেসারত দিতে গিয়ে আজ তার স্বামী মৃত্যুদণ্ডের আসামি হয়ে কারাগারে। তিনি ঘটনার সুরাহা চান। থানা পুলিশ জানায়, আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, তবে আদালতের চূড়ান্ত আদেশ এখনো পাওয়া যায়নি।