ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো নারীকে বিনা প্রমাণে 'দুশ্চরিত্রা' বলা বা তার চরিত্র নিয়ে কটূক্তি করা এক অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। একে 'কাজফ' বা ব্যভিচারের অপবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট, মন্তব্য বা শেয়ার মুহূর্তেই বহু মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা ব্যক্তির সম্মান ও সামাজিক অবস্থানে গভীর আঘাত হানতে পারে। তাই অনলাইন ও অফলাইন সব জায়গাতেই একজন মুসলমানের জন্য সংযম ও সত্যনিষ্ঠা অবশ্য পালনীয়।

ইসলামের ফিকহশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষ মৌলিকভাবে দায়মুক্ত; অর্থাৎ কোনো অভিযোগ সুপ্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ ধরতে হবে। ইবনে নুজাইমের 'আল-আশবাহ ওয়ান-নাজায়ির'-এ এ কথাই বলা হয়েছে। শুধু সন্দেহ, গুজব বা ব্যক্তিগত ধারণার বশে নারীর যৌন-চরিত্র নিয়ে অপবাদ দেওয়া এই নীতির পরিপন্থী। ইমাম শাতিবি তাঁর 'আল-মুয়াফাকাত' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মানুষের জীবন, ধর্ম, বিবেক, সম্পদ ও বংশ—এই পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের সুরক্ষা প্রদান শরিয়তের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। সুতরাং কারও সম্মানহানি করা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না।

পবিত্র কোরআনের সুরা নুরের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছেন: 'যারা সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদেরকে আশি বেত্রাঘাত করো এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না, আর তারাই ফাসিক।' এ থেকে বোঝা যায়, ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী আবশ্যক। এই কঠোর শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে অভিযোগকারী নিজেই শাস্তির সম্মুখীন হবে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে অপবাদ শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নেই। ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স বা ইনস্টাগ্রামে লিখিত মন্তব্য, ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট বা ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্যও মানুষের সম্মান নষ্ট করে। ইসলামের দৃষ্টিতে অনলাইন ও অফলাইনের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহ তাআলা সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, 'হে মুমিনগণ, তোমরা অধিকতর ধারণা থেকে বিরত থাকো, কিছু ধারণা পাপ। একে অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং পরস্পরের নিন্দা করো না।' এই নির্দেশনা সন্দেহ, গুজব ও কুধারণা থেকে দূরে থাকতে শেখায়।

ভাষার ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসুল (সা.) সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপের বিষয়ে সতর্ক করেছেন, যার মধ্যে সতী ও ইমানদার নারীর প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ অন্যতম। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, একজন মানুষ এমন একটি শব্দ উচ্চারণ করে যার পরিণাম সে ভাবে না, অথচ সেই একটি শব্দের কারণে সে জাহান্নামে পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্বের চেয়েও বেশি দূরে নিক্ষিপ্ত হবে। তাই মুখের কথা বা লিখিত শব্দ—প্রতিটি উচ্চারণের জন্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

সমালোচনা ও অপবাদ এক নয়। ভুল সংশোধনের জন্য শালীন সমালোচনা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, বরং তা সমাজকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া চরিত্র হনন বিশৃঙ্খলা ও শত্রুতা সৃষ্টি করে। কারও আচরণে আপত্তি থাকলে তা ভদ্র ভাষায় জানানো যায় বা আইনি পথে সমাধান চাওয়া যায়। কিন্তু বিনা প্রমাণে চরিত্র নিয়ে কটূক্তি করা ইসলামি নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই ডিজিটাল যুগে একজন মুসলিমের প্রতিটি লেখার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—তা কি সত্য, ন্যায়সংগত এবং কারও সম্মান নষ্ট করছে কি না। কারণ সামাজিক মাধ্যমে লেখা শব্দ শুধু পর্দায় সীমাবদ্ধ থাকে না, ইহকাল ও পরকালে তা নৈতিক জবাবদিহির অংশ হয়ে যায়।