শিশুদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের প্রবণতা বর্তমান সময়ে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অভিভাবকরা নিজ হাতে সন্তানের কান্না, হাসি, রাগ, আধো বুলি এবং অসতর্ক অবস্থার ছবি-ভিডিও ধারণ করে ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করছেন। এই চর্চা ‘শেয়ারেন্টিং’ নামে পরিচিত। ইসলামি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এই অভ্যাসের মধ্যে চার স্তরের সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রথম স্তরটি আমানত নিয়ে। ইসলামি শিক্ষা মতে, সন্তান মা-বাবার কাছে আল্লাহর আমানত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের আমানতের খেয়ানত করতে নিষেধ করেছেন। শৈশবে শিশুর নিজের ভালো-মন্দ বা গোপনীয়তা বোঝার ক্ষমতা থাকে না। সেই অবস্থায় তার প্রতিটি মুহূর্ত কোটি মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া আমানতের খেয়ানত বলে গণ্য। নবী করিম (সা.) হাদিসে বলেছেন, প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

দ্বিতীয় স্তরে আসে শিশুর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টি। নিয়মিত শিশুর ছবি-ভিডিও শেয়ার করলে তার ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। শিশু বড় হয় এক কৃত্রিম পরিবেশে, যেখানে ক্যামেরার সামনে কীভাবে হাসতে হবে বা আচরণ করতে হবে তা শিখতে শিখতে তার স্বাভাবিক শৈশব নষ্ট হয়। ইসলামে কুদৃষ্টি বা নজর লাগাকে গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তব বিষয় হিসেবে দেখা হয়। নবীজি (সা.) তার নাতিদের কুদৃষ্টি ও হিংসা থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ দোয়া পড়তেন এবং তাদের আড়াল করতেন। অভিভাবকেরা ভিউ ও প্রশংসার লোভে সন্তানকে ক্যামেরার সামনে রেখে অজান্তে তাদের কুদৃষ্টি ও মানসিক ঝুঁকির মুখে ফেলছেন।

তৃতীয় স্তরটি নিয়তের বিশুদ্ধতা নিয়ে। শেয়ারেন্টিংয়ের অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট বা স্পনসরশিপের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের যন্ত্র বানানো হয়। শিশুর কান্না লাইভ করে ভিউ বাড়ানোরও ঘটনা ঘটে। ইসলাম হালাল উপার্জনের নির্দেশ দিলেও সন্তানের শৈশব ও মর্যাদাকে পুঁজি করে অর্থ আয়ের এই সংস্কৃতি সমর্থন করে না। হাদিসে লোকদেখানো নিয়তকে আধ্যাত্মিক পতন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

চতুর্থ স্তরটি ভবিষ্যৎ জীবনের কথা বিবেচনা করে। আজকের শিশু বড় হয়ে নিজের ব্যক্তিত্ব ও বন্ধুমহল তৈরি করবে। তখন ইন্টারনেটে থেকে যাওয়া পুরোনো ভিডিওগুলো তাকে সামাজিক লজ্জা ও হীনম্মন্যতার মুখে ফেলতে পারে। কোরআনে মানবসন্তানকে মর্যাদা দান করার কথা বলা হয়েছে। তাই সন্তানের মর্যাদা রক্ষা করা এবং সাময়িক বিনোদন বা আর্থিক লাভের জন্য তাকে উপহাসের পাত্র না বানানো অভিভাবকের কর্তব্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান কোনো কনটেন্ট বা পণ্য নয়, সে একজন জীবন্ত মানুষ। তাকে ক্যামেরার কৃত্রিম আলো থেকে দূরে রেখে বাস্তব পৃথিবীর আলো-বাতাসে বড় হতে দেওয়াই উত্তম।