ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়কদের উত্থান-পতন চিরাচরিত ঘটনা। কেউ কিছু বছর ঝড় তোলেন, কেউ দীর্ঘদিন রাজত্ব করেন, আবার কালের গর্ভে বিলীন হন অনেকেই। কিন্তু টানা ২৭ বছর ধরে দর্শকের আগ্রহ, পোস্টারে উপস্থিতি এবং ঈদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকার গল্পটি কেবল একজনই লিখতে পেরেছেন— শাকিব খান। পোস্টার সাঁটানো আর মাইকের প্রচারের দিন থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটালের যুগেও তাঁর তারকাখ্যাতি অমলিন। নতুন কোনো ছবির পোস্টার, টিজার বা গান মুক্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সাড়া পড়ে, তা জানান দেয়, আড়াই যুগ পরেও দর্শকের প্রথম পছন্দ তিনিই।

১৯৯৯ সালের ২৮ মে 'অনন্ত ভালোবাসা' দিয়ে শুরু হয়েছিল এই পথচলা। ঠিক ২৭ বছর পর, একই দিনে মুক্তি পেয়েছে তাঁর ২৫৫তম সিনেমা 'রকস্টার'। তাই এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা শুধুই উৎসব নয়, এটি যেন শাকিবের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এক বিশেষ মাইলফলক। ঈদের আগ থেকেই সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতিচারণার ঢল নেমেছিল। ভক্তরা লিখছেন, 'যার নামে এখনো দর্শক হলমুখী হয়', 'ঢালিউডের শেষ সুপারস্টার', কিংবা '২৭ বছরেও তিনিই নাম্বার ওয়ান'। পুরোনো পোস্টার, ডায়ালগ আর গান শেয়ার করে অনেকে স্মরণ করছেন প্রথম বার সিনেমা হলে তার অভিনয় দেখার মুহূর্ত।
বিশেষ করে 'প্রিয়তমা', 'তুফান', 'বরবাদ' ও 'তাণ্ডব'-এর পর নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উন্মাদনা। যাঁরা একসময় ওটিটি বা বিদেশি কন্টেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরাও ঈদের ছবি দেখতে ফিরছেন প্রেক্ষাগৃহে। ফলে শাকিব খান এখন শুধু নস্টালজিয়ার নাম নন, বরং একাধারে পুরনো ও নতুন দুই প্রজন্মের কাছেই গ্রহণযোগ্য এক তারকা। এর বড় প্রমাণ মিলেছে এবারের ঈদে। 'রকস্টোর' দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক ১০৩টি প্রেক্ষাগৃহ পেয়েছে। ঈদের দিন স্টার সিনেপ্লেক্সে ১৮টি শো চলার পর দর্শকচাপ এতটাই বেড়ে যায় যে, পরদিনই শো-সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩৬-এ পৌঁছয়। টিকিট না পেয়ে অনেকেই হতাশা জানিয়েছেন।
কিন্তু আজকের এ সাফল্যের পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। সোহানুর রহমান সোহানের 'অনন্ত ভালোবাসা'র সেই হ্যাংলা-পাতলা যুবককে দেখে কেউ হয়তো ভাবেননি তিনি একদিন সর্ববৃহৎ তারকা হবেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে উপহাস ও অভিনায় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। সালমান শাহর মতো প্রথম ছবিতেই উত্থান হয়নি তার। দীর্ঘদিন তাকে অপেক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়েছে। মুনমুন, সাহারা, পরে শাবনূর, পপি, পূর্ণিমাদের সাথে অভিনয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার জায়গা। নায়ক মান্নার মৃত্যুর পর শাকিবের ভাগ্য খুলে যায়—এমন একটা ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবতা হলো, নিজের শ্রম দিয়ে সেই ভাগ্য তৈরি করে নিতে হয়েছে তাকে।
ক্যারিয়ারের বড় একটা সময় কেবল বাণিজ্যিক নায়ক হিসেবে বিবেচিত হলেও, চাষী নজরুল ইসলামের 'সুভা' সেই ধারণা পাল্টে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পনির্ভর চলচ্চিত্রে তার অভিনয় সমালোচকদের নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করে। পরে 'দেবদাস' তাকে অভিনয়শিল্পীর স্বীকৃতি এনে দেয় এবং 'কোটি টাকার কাবিন' দেয় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা। এক সময় গিয়ে দেখা যায়, মানুষ সিনেমা নয়, বরং 'শাকিব খান' কে দেখতেই হলমুখী হচ্ছেন।
এক সময় ব্যক্তিগত জীবন, বিয়ে-বিচ্ছেদ, অপু বিশ্বাস-বুবলী সংক্রান্ত বিবাদ, মামলা, বর্জন ও ইন্ড্রাস্ট্রির রাজনীতি তাকে তীব্র নেতিবাচক সমালোচনায় ঘিরে ফেলে। সিনেমাপাড়ায় অনেকে বলতে শুরু করেন, 'শাকিবের জাদু শেষ।' এই অধ্যায়কেই পরবর্তীকালে তিনি নিজের জীবনের কঠিনতম সময় বলে বর্ণনা করেন। ২০২৫ সালের ২৩ মে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের আসরে বিশেষ সম্মাননা নিতে গিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, 'এই ইন্ড্রাস্ট্রি আমাকে অনেক রং দেখিয়েছে। অনেক কাছের মানুষও বলেছে, “তোমার দিন শেষ, ইউ আর ডেড হর্স।”' তিনি নিজেও ভেবেছিলেন, হয়তো বিদায় নিতে হবে। কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা তাকে শেষ চেষ্টা চালাতে উদ্বুদ্ধ করে, যার নাম ছিল 'প্রিয়তমা'। ২০২৩ সালে ছবিটি কেবল সুপারহিট হয়নি, তার ক্যারিয়ারের গতি পুরোপুরি পাল্টে দেয়। দেশে ও প্রবাসে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি করে এটি।
'প্রিয়তমা'র পর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। 'রাজকুমার', 'তুফান', 'বরবাদ', 'তাণ্ডব' তার মর্যাদা আরও বাড়িয়েছে। এখন সমালোচকও স্বীকার করেন, তিনিই সেরা। কলকাতায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার অবস্থান দৃশ্যমান। নিজের চেহারা, ফিটনেস, গল্প ও নির্মাণশৈলীতে পরির্বতন এনে তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছেন তিনি। বর্তমানে প্রযোজকদের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম শাকিব খান। হল মালিক থেকে পরিবেশক— সবাই জানেন, তার নাম থাকলেই দর্শকের আগ্রহ নিশ্চিত। আগে বছরে ১০-১২টি ছবি করলেও এখন মান ও আন্তর্জাতিক পরিকল্পনায় মনযোগী তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়-বিতর্ক তার পেশাদার অগ্রগতিকে থামাতে পারেনি; বরং অদ্ভুতভাবে প্রতিটি ফিরে আসায় দর্শকের উৎসাহ যেন আরও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, 'অনন্ত ভালোবাসা' থেকে 'রকস্টোর'—এই দীর্ঘ পথে শাকিব খান নিজেকে শুধু নায়ক নন, একটি যুগের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যখন নানা সংকটে, তখনো এই একটি নামই প্রত্যাশা আর সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি হয়ে আছেন।