ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ এখন সর্বত্র। বাড়ি আর অলিগলিতে প্রিয় দলের পতাকা টানানো, জার্সি বানানো, দল বেঁধে বড় পর্দায় খেলা দেখা, খাওয়াদাওয়া কিংবা প্রিয় দলের সমর্থনে মিছিল, শোভাযাত্রার মতো বর্ণিল আয়োজন দেখা যাচ্ছে হাওর জনপদ সুনামগঞ্জেও। সঙ্গে আছে তর্কবিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি আক্রমণও চলছে। সুনামগঞ্জ শহরে যেমন বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা আছে, তেমনি গ্রামেও সরব সমর্থকেরা। তবে আলোচনা, উচ্ছ্বাস বেশি বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে নিয়ে। গতকাল শনিবার ভোরে খেলা ছিল আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের। সেই খেলা নিয়ে নাট্যকর্মী দেওয়ান গিয়াস ও মেহেদী হাসানের মধ্যে তুমুল তর্ক ও খোঁচাখুঁচি চলছিল। ব্রাজিল সমর্থক মেহেদী হাসান আর্জেন্টিনা দলের সমর্থক দেওয়ান গিয়াসকে লক্ষ করে বলছিলেন, ‘মেসিদের কি নাকানিচুবানিটাই না দিল কেপরা। সামনে মনে হয় বিদায় নিতে অইব মেসিদের। যা দেখছি, এবার মনে হয় কাপটা ব্রাজিলেরই।’ দেওয়ান গিয়াস মুচকি হাসেন। বলেন, ‘যার নাম (নেইমার) নিয়ে এত ফুটানি, সে তো এখনো সেভাবে মাঠে নামেনি। মাঠের অবস্থা তো নড়বড়ে। আর বিশ্বকাপের স্বপ্ন, সেটা এবার স্বপ্নই থাকবে হলদে পাখিদের।’ শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি গণগ্রন্থাগারে এই আড্ডা-তর্কে নিজেদের দলের পক্ষে বেশ জোরালো সমর্থন তুলে ধরেন আর্জেন্টিনার সমর্থক তরুণ আইনজীবী এ আর জুয়েল, সংস্কৃতিকর্মী শহীদ নূর আহমদ, ব্রাজিল সমর্থক গণমাধ্যমকর্মী লিপসন আহমদ, মনোয়ার চৌধুরী প্রমুখ। তুমুল তর্কযুদ্ধের ফাঁকে আবার মিলেমিশে চা–নাশতাও চলছিল। আইনজীবী এ আর জুয়েল বলছিলেন, ‘লড়াইটে ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই করতে হচ্ছে। এখানে আক্রমণ, ঘরেও একই অবস্থা। এঁরা (ব্রাজিল সমর্থক) মানে না।’ জানা গেল, তাঁর স্কুলশিক্ষক স্ত্রী ফারজানা সুলতানা ব্রাজিলের সমর্থক। মনোয়ার চৌধুরীর বাড়ি শহরের ষোলঘর এলাকায়। তিনি জানান, তাঁদের এলাকার তরুণ-যুবকেরা মিলে মহল্লার বেশ কয়েকটি স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন। সব শ্রেণি–পেশার লোকজনই জড়ো হয়ে বড় পর্দায় খেলা দেখেন। এতে সবার মাঝেই একটা সৌহার্দ্য–সম্প্রীতিও তৈরি হয়েছে। ব্রাজিল ফুটবল দলের সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ পৌর শহরে এবার ছোট কয়েকটি দেশের দল বেশ ভালো খেলছে বলে মনে করেন একই এলাকার বাসিন্দা সাবেক ফুটবলার লুৎফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যদিও আমাদের এখানে তাদের সমর্থক ওইভাবে নেই। তবে তাঁদের খেলা বেশ ভালো লাগছে। সমর্থক বেশি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার। তাদের নিয়ে উচ্ছ্বাস–উন্মাদনা চলছে। শহরে দুই দলের সমর্থকেরা বড় বড় শোডাউন করেছেন। এটি ভালো লাগছে।’ প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা ও সমর্থন প্রকাশ করতে শহরের মল্লিকপুর এলাকার ২৪ জন যুবক মিলে আবদুজ জহুর সেতু সড়কের পাশে টানিয়েছেন আর্জেন্টিনার ৩০০ ফুট লম্বা দীর্ঘ একটি পতাকা। আর্জেন্টিনার সমর্থক তালহা আহমদ জানালেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই লাতিন আমেরিকার দেশটির সমর্থক। তাঁর বাবা, চাচাসহ পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার ভক্ত। তাঁরা ২৪ জন পতাকা টানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমরা আশাবাদী, এবারও বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাই ঘরে তুলবে।’ এলাকার আরেক বাসিন্দা ফুটবলপ্রেমী ওয়ালীউল্লাহ সরকার তরুণদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘আমাদের মল্লিকপুর এলাকায় সেতু সড়কের পাশে এত লম্বা পতাকা টাঙিয়ে রেখেছে একঝাঁক আর্জেন্টিনা ফুটবলপ্রেমী। আমিও একজন ভক্ত। আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা ও মেসি জগদ্বিখ্যাত খেলোয়াড়। আমরা তাঁদের ভালোবাসি। শুধু শহরে নয়, জেলার দিরাই উপজেলার রফিনগরেও টানানো হয়েছে আর্জেন্টিনার একটি বড় পতাকা।’ সম্প্রীতি-সৌহার্দ্যের শোভাযাত্রা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফুটবল সমর্থকেরা আড্ডায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে যেভাবে নিজে দলের পক্ষ সরব, তেমনি ‘রাজপথেও’ নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। উল্লাস করছেন। গত ১০ জুন বিকেলে সুনামগঞ্জ শহরে বর্ণাঢ্য মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা করেন ব্রাজিল সমর্থকেরা। একইভাবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে এরপর ১৬ জুন শহরে আরেকটি শোভাযাত্রা করেন আর্জেন্টিনা দলের সমর্থকেরা। কয়েক শ মোটরসাইকেল ছিল সেই শোভাযাত্রায়। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে, হাতে পতাকা নিয়ে, মুখে বাঁশি বাজিয়ে মিছিল স্লোগানে উল্লাস প্রকাশ করেন তাঁরা। এটিতে তাঁরা নাম দিয়েছেন ‘সম্প্রীতি সৌহার্দ্যের শোভাযাত্রা’। এমন আনন্দ আয়োজন উপভোগ করেন শহরের ফুটবলপ্রেমীরা। ব্রাজিল সমর্থক তরুণ সমাজকর্মী আবু সালেহ বলেন, ‘আমরা ফুটবল ভালোবাসি। ফুটবল তো শুধু খেলা নয়, এটি আবেগেরও নাম। প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং সমর্থকদের একত্র করতেই শোভাযাত্রার আয়োজন ছিল।’ সুনামগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক কমিটির সাবেক সদস্য ক্রীড়া সংগঠক এনাম আহমেদ বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে সবার মধ্যে যে আনন্দ-উল্লাস আমরা দেখি, সেটি ইতিবাচক। বিশেষ করে তরুণেরা নানাভাবে নিজেদের আবেগ, সমর্থন প্রকাশ করেন। এটা সমাজে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বাড়ায়।’