চার কিশোরের আত্মহত্যার ঘটনায় প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে একটি নতুন মামলা দায়ের করেছেন নিহতদের পরিবার। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারের ফলে বছরের পর বছর ধরে ক্রমবর্ধমান ক্ষতির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে। ডেলাওয়্যারের সুপিরিয়র কোর্টে বৃহস্পতিবার দায়ের করা এই মামলাটি সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর প্ল্যাটফর্মকে আসক্তিকর ও বিপজ্জনক দাবি করে দায়ের করা একাধিক মামলার সর্বশেষ সংযোজন।

অভিযোগটি টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা, মিনেসোটা ও টেনেসির চারটি পরিবারের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, যাদের সন্তানেরা ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসের ব্যবধানে মারা যায়। পরিবারগুলোর পক্ষে মামলা পরিচালনা করছে সোশ্যাল মিডিয়া ভিকটিমস ল’ সেন্টার। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা অ্যাটর্নি ম্যাথিউ বার্জম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একই ধরনের মামলা দায়েরের ‘অনেক পরে’ এই মামলার শিশুদের মৃত্যু হওয়াটি ‘বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য’। তিনি মন্তব্য করেন, “তাদের শীর্ষ কর্তাদের মুখে ভণিতা সত্ত্বেও এই প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের হত্যা করে চলেছে। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বরং বিশ্বজুড়েই শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিদ্যমান বিপদ।”

আত্মহননকারী এই চার কিশোরের প্রত্যেকেই বছরের পর বছর সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে সংযুুক্ত আসক্তি, চরম অনিদ্রা, বিষণ্ণতা, উৎকণ্ঠা এবং আত্মহত্যার চিন্তার মতো জটিলতার শিকার হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত কিশোররা হল ১৩ বছর বয়সী লিভি কাস্ত্রো, ১৪ বছর বয়সী রিভ কেলেহার, ১৭ বছর বয়সী ন্যাথানিয়েল চেম্বারস এবং ১৮ বছর বয়সী ডসন হোল্ডেন। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষতি করছে তা জেনেও তারা সে বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ইউটিউবের মালিকানাধীন গুগলের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, “তরুণদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর অভিজ্ঞতা প্রদান বরাবরই আমাদের কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য ও অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায়, আমরা বয়সোপযোগী অভিজ্ঞতা এবং অভিভাবকদের জন্য জোরালো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নির্মাণ করেছি। আমরা পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং এই মামলার দাবিগুলো পর্যালোচনা করছি।” মেটা, টিকটক ও স্ন্যাপের প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

দ্য টেক ওভারসাইট প্রজেক্টের নির্বাহী পরিচালক সাচা হেওয়ার্থ এক বিবৃতিতে বলেন, অভিভাবক, সমাজকর্মী ও হুইসনলোয়াররা বছর ধরে আইনপ্রণেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন কিন্তু “কংগ্রেস যখন গতিহীন, আরও অনেক শিশু প্রাণ হারিয়েছে।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নের গতি অত্যন্ত ধীর। এই মামলার তারিখের ঠিক দুই বছর আগে সিনেট কিডস অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট পাস করলেও প্রতিনিধি পরিষদে তার ভোট হয়নি, এবং বর্তমানে উভয় কক্ষই মূল বিধানগুলো নিয়ে একমত হতে পারছে না। হোয়ার্থ আরও বলেন, “লিভি, নাথানিয়েল, ডাওসন ও রিভের ঘটনা প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে মিথ্যা বলে চলেছে এবং এর পরিবর্তে কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার খরচ করে মিথ্যা বিজ্ঞাপন, বিশ্বস্ত শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে বিভ্রান্তিকর পরিশোধিত অংশীদারিত্ব এবং রাজনৈতিক লবিং বেছে নিয়েছে।”

মেটা, ইউটিউব, টিকটক ও স্ন্যাপ অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য স্তরের অসংখ্য মামলার সম্মুখীন হচ্ছে। এ সপ্তাহে টেনেসিতে মেটার বিচার চলছে রাষ্ট্রীয় অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়ের করা একটি মামলায়, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে কোম্পানিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ইনস্টাগ্রামসহ তাদের প্ল্যাটফর্ম তরুণদের জন্য আসক্তিকর করে তৈরি করেছন এবং তার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেনি। আগস্টে ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে আরেকটি মামলার মুখোমুখি হবে মেটা, যেখানে ২০২৩ সালে ডজনখানেক রাজ্যের একত্রে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, আসক্তির নকশা তৈরি করে কোম্পানি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটে ভূমিকা রাখছে এবং অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া ১৩ বছরের নিচে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে ফেডারেল আইন লংঘন করেছে। সকল মামলাতেই কামিয়াবি হয় না, এবং অনেকে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তিও হয়। গত সপ্তাহে ফ্লোরিডার এক কিশোর কোনো অর্থ গ্রহণ না করেই লস অ্যাঞ্জেলেসে মেটার বিরুদ্ধে তার মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। মেটা যুক্তি দিয়েছিল, কিশোরটি দিনে মাত্র কয়েক মিনিট করে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহার করত এবং মামলা করার জন্য আইনজীবী নিয়োগের পরেই বেশিরভাগ অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। তথাপি, বাড়তে থাকা আদালতের মামলা মেটা প্ল্যাটফর্মের মতো কোম্পানির জন্যেও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। সপ্তাহের শুরুতে মেটা জানিয়েছে দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের আইনি ব্যয় হয়েছে ২৪০ কোটি ডলার, যা তাদের মুনাফায় ১৪% পতনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অস্বাভাবিক এক ভূমিকা রেখেছে।