চট্টগ্রাম নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে উঠে এসেছে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। পুলিশের উপস্থিতি, মামলা ও সিসি ক্যামেরার নজরদারি থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা নিখুঁতভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে চার সন্ত্রাসী পিস্তল, এসএমজি, চায়নিজ রাইফেল ও শটগান নিয়ে হামলা চালিয়ে চলে যায়। ওই সময় বাড়িটির সামনে পুলিশ মোতায়েন ছিল। স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ প্রথমে ১০ কোটি, পরে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না পেয়ে গত ২ জানুয়ারি বাসায় গুলি করা হয়, পরে পুলিশ মোতায়েন ও মামলা হয়। এরপরও চাঁদা না পেয়ে ২০ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে 'ওয়েট অ্যান্ড সি' বার্তা পাঠায় সাজ্জাদ।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ মো. রেজাউল কবির বলেন, ঘুমের মধ্যে গুলির শব্দে বাচ্চারা আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে। জানালা দিয়ে দেখেন খালের ওপারের বাড়িতে গুলি চলছে, জানালার গ্লাস ভাঙা। তিনি বলেছেন, ২০১৭ সাল থেকে এলাকায় শিক্ষকতা করছেন, এমন ঘটনা আগে দেখেননি বা শোনেননি। পুলিশ সন্ত্রাসীদের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ করতে পারেনি বলেও অভিযোগ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বড় সাজ্জাদ ছাড়াও শহরে সক্রিয় রয়েছে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন, মোহাম্মদ রায়হান, শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা, বার্মা সাইফুল, বাকলিয়াকেন্দ্রিক মোরশেদ খান গ্রুপ ও আবদুস সোবহান-শওকত গ্রুপসহ কমপক্ষে আটটি বড় অপরাধী চক্র। এছাড়া মুরাদপুর-পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংও সক্রিয়। পুলিশের তালিকায় ছোট-বড় তিন শতাধিক সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ১২৫টি খুনের মামলা হয়েছে, আর চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে খুন হয়েছেন ২৫ জন।

প্রথম আলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ৩৫টি আলোচিত খুনের ঘটনায় ২২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ঘুরেফিরে ১৩ জন শুটার বা হামলার সংগঠকের নাম আসছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নগরে ৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে অক্সিজেন, বালুচরা, হামজারবাগ, চন্দনপুরা, চান্দগাঁও, বাদুরতলা, খুলশী, বার্মা কলোনি, বাকলিয়া ও কালুরঘাট এলাকা উল্লেখযোগ্য। অবস্থা এমন যে, ১৪ জুলাই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন ব্যবসায়ীরা। এর আগের দিন বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে ডিজিটাল ডট নেট প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ৩৫ লাখ টাকা লুট হয়; দুই দিন আগে ডেভিড ইমন ফোনে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন।

সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আচরণের কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানা-পুলিশে যেতেও ভয় পান। বালুছড়া উত্তর কুলগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় ১৫-২০টি গুলি হলেও মামলা করেননি থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আহমদ রেজা। বাকলিয়ায় এক ব্যবসায়ীর বাসার দরজায় লাল রঙের সাতটি দাগ এঁকে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়, পরে তিনি চুপচাপ পাঁচ লাখ টাকা দেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বায়েজিদের কালারপুল এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে তিন অস্ত্রধারী গুলি ছোড়ে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই সময়ে চাঁদাবাজির ৬৮টি মামলা হয়েছে, তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে। কেউ বিদেশ থেকে নির্দেশ দেয়, কেউ শহরে গুলি করে পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেয়। কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, ঝুট ব্যবসা, গ্যারেজ, বালুমহাল, ফুটপাত ও মাদক থেকে টাকা তোলে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলেই গুলি বা ত্রাস। অস্ত্রের যোগান মিলছে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের রেখে যাওয়া অস্ত্র থেকে, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা চালান থেকেও। পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগসাজশের তথ্যও রয়েছে পুলিশের কাছে।

সবচেয়ে আলোচিত সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ২০০৪ সাল থেকে বিদেশে বসে নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। পুলিশের হিসাবে তার বাহিনীতে ৫০ জনের মতো শুটার সক্রিয়, আর অন্তত ১৫টি খুন ও গুলির ঘটনায় তার বাহিনী জড়িত। দেশে তার দল পরিচালনা করত ছোট সাজ্জাদ, যার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে; সে ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছে। সদস্য নিয়োগে ধর্মীয় গ্রন্থ ছুঁইয়ে শপথ ও ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। বড় সাজ্জাদের হয়ে নির্মাণাধীন ভবন চিহ্নিত করার জন্য অর্ধশতাধিক 'সোর্স' কাজ করে, যাদের সাপ্তাহিক বেতন পাঁচ হাজার টাকা। ৫ মার্চ গ্রেপ্তার সাইদুল ইসলাম এমনই এক সোর্স, যে ভবনের ভিডিও ধারণ করে পাঠাতো।

ফেসবুকও হয়ে উঠেছে অস্ত্র। বায়েজিদের সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করে ভিডিও দিতেন, পাল্টা হুমকি আসত। গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গায় আকবরকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার পরিকল্পনায় মোহাম্মদ রায়হানের নাম আসে। রায়হান শহরে ঘটনা ঘটিয়ে রাউজান-রাঙ্গুনিয়া-ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় আস্তানা গাড়ে। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। চান্দগাঁও-পাঁচলাইশের আতঙ্ক বুইস্যার বিরুদ্ধে ২০টি মামলা, তার বাহিনীর টর্চার সেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। টাকা গোনার মেশিনসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারও হয়েছে। মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন ছোট সাজ্জাদের ডান হাত হিসেবে পরিচিত, অস্ত্র চালনায় দক্ষ, ১৫টি মামলার আসামি, বর্তমানে কারাগারে। মোহাম্মদ বোরহান নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা আদায় করতেন, তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা। মেহেদী হাসান বাকলিয়া জোড়া খুনের পরিকল্পনায় জড়িত, ১৩টি মামলা, নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে গ্রেপ্তার। বাকলিয়ায় মোরশেদ খান ও তার প্রাক্তন শিষ্য আবদুস সোবহানের মধ্যে আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে পথচারী ও শ্রমিকরা আহত হয়েছেন। বার্মা সাইফুলের বাহিনী বায়েজিদ, খুলশী ও আকবর শাহ এলাকায় সক্রিয়।

সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেছেন, অস্ত্রসহ বেশ কিছু সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত। র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেছেন, খুন ও গোলাগুলির অধিকাংশ ঘটনা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে; চাঁদাবাজি ও মাদকই এর প্রধান কারণ। তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেছেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের কারণেই সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে, অপরাধী যে দলেরই হোক তাকে অপরাধী হিসেবেই ধরতে হবে। নগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকার কিছুই করতে পারছে না। পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী স্বীকার করেছেন, মাঠপর্যায়ের কিছু পুলিশ সদস্য সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে মাসোয়ারা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে; এ বছর ২০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।