বিশ্ব রাজনীতির পুরোনো কাঠামো যখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ বাড়ার পাশাপাশি উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট। এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জন্য ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছে ভারত। বছরের শুরুতে এ দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দেশটি জোটটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক অমিত রঞ্জনের মতে, ভারত এমন এক জোটের নেতৃত্বে এসেছে, যার সদস্যদের মধ্যে বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে গভীর দ্বিমত বিদ্যমান। ভারতের ঘোষিত মূলমন্ত্র ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’ অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি ব্রিকসের ধারণা তুলে ধরলেও, ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোকে একমুখী করা যে সহজ নয়, তা সভাপতিত্বের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রকট হয়েছে।

জোটের সম্প্রসারণের ফলে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার মূল কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ। ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রসারিত এই ব্রিকস এখন বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। কিন্তু এই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সদস্যদের মধ্যে স্বার্থগত ও ভূরাজনৈতিক বৈচিত্র্যও। একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রভাব বেড়েছে, তেমনি অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গঠন ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে। এই জোটের অভ্যন্তরে চীন ও ভারত একই সংগঠনের সদস্য, অথচ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরমে। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক কৌশলগত সম্পর্ক থাকলেও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কও দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। এছাড়া ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সদস্যদের মধ্যে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও প্রকট।

ভারতের জন্য সবচেয়ে কঠিন সমীকরণ হলো চীন। সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন। তবে সম্প্রতি সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একটি প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি সফর করে, যা ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পর্যায়ের যোগাযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে শাকসগাম উপত্যকায় চীনের অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে এমন এক সংগঠনের নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান সদস্যই তার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী। দিল্লিকে একদিকে ব্রিকসকে চীনবিরোধী মঞ্চে পরিণত করা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সমঝোতা এড়িয়ে নিজের কৌশলগত স্বার্থও রক্ষা করতে হচ্ছে। যেসব ক্ষেত্রে স্বার্থের মিল আছে সেখানে সহযোগিতা এবং যেখানে সংঘাত আছে সেখানে প্রতিযোগিতা—এই নীতিই দিল্লির জন্য বাস্তবসম্মত পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতের জন্য আরও বড় সতর্কবার্তা এসেছে মে মাসে। ১৪ ও ১৫ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে সদস্যরা যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব থেকে পৃথক ‘সভাপতির বিবৃতি’ প্রকাশ করতে হয়, যেখানে মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করা হয়। এই ঘটনা ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। ভারতকে একদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সামলাতে হচ্ছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা প্রশ্নে ভারতের জ্বালানি-নিরাপত্তা সরাসরি জড়িত। ফলে বৃহৎ শক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর আঞ্চলিক বিরোধও সামলাতে হচ্ছে ভারতকে।

ব্রিকসকে অনেকেই ‘পশ্চিমবিরোধী জোট’ হিসেবে দেখলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে মিল থাকলেও পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে; রাশিয়ার সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সম্পর্কও অটুট। ফলে ব্রিকসকে পশ্চিমের বিপরীতে দাঁড় করানো ভারতের জন্য কাম্য নয়। বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ ও প্রভাবের জায়গা শক্তিশালী করার জন্য ব্রিকস একটি কার্যকর দর-কষাকষির মঞ্চ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ভারতের ঘোষিত ‘সংস্কার করা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা’র ধারণাটিও পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার বদলে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর পক্ষে।

ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চারটি মূল প্রশ্নের উত্তরের ওপর। প্রথমত, ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর মধ্যে ন্যূনতম কার্যকর সমঝোতা তৈরি করতে পারবে কিনা। দ্বিতীয়ত, একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারবে কিনা যা সদস্যদের জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনবে। তৃতীয়ত, বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিকে বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দিতে পারবে কিনা। চতুর্থত, সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির পরও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কিনা। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর স্পষ্ট যে, ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এখন বাস্তব কূটনৈতিক সমস্যা। ভারতের জন্য আসল চ্যালেঞ্জ ঐকমত্য তৈরি করা নয়, বরং মতপার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখা এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সচল রাখা। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, উন্নয়ন ও জ্বালানি খাতে অগ্রগতি হলে রাজনৈতিক বিভাজন জোটকে অকার্যকর করে তুলতে পারবে না। সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লির শীর্ষ সম্মেলন তাই শুধু বার্ষিক বৈঠক নয়; এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ভারত কি ব্রিকসকে নিজের প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি ভিন্ন স্বার্থের শক্তিগুলোকে এক টেবিলে রেখে কার্যকর বহুপক্ষীয় মঞ্চ গড়ে তুলবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।