চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। এর ফলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কমে যাওয়া পাসের হার ও বিপুল সংখ্যক অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর বিষয়টি। তবে ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যারা উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশের ফল মাঝামাঝি পর্যায়ে অবস্থান করছে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী খুব সামান্য নম্বর পেয়ে পাস করেছে, যা তাদের পরবর্তী শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক অংশ জিপিএ-৪ থেকে ৫-এর নিচে ফল পেয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৩ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ১৯ শতাংশ। সাধারণভাবে এই স্তরের শিক্ষার্থীরা প্রতিটি বিষয়ে গড়ে ৭০ থেকে ৭৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছে বলে ধরা হয়। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ, প্রায় ৩৮ শতাংশ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি, যা পাসের হার হ্রাসের মূল কারণ।

গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, এবার মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী, যার সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজারের কিছু বেশি। এই শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ে গড় নম্বর ৮০ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, জিপিএ-৪ থেকে ৫-এর নিচে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীর হার ১৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অর্থাৎ, ফলাফলের সর্বোচ্চ স্তরের ঠিক নিচে অবস্থান করা শিক্ষার্থীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।

ফলের আরও গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিপিএ-৩ দশমিক ৫ থেকে ৪-এর নিচে পেয়েছে ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৩ থেকে ৩ দশমিক ৫-এর নিচে পেয়েছে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এই দুই স্তর মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মধ্যম মানের ফল অর্জন করেছে। এছাড়াও, জিপিএ-২ থেকে ৩-এর নিচে পেয়েছে ১২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ শিক্ষার্থী, যেখানে জিপিএ-১ থেকে ২-এর নিচে পাওয়া শিক্ষার্থীর হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কতজন পাস করেছে বা কতজন জিপিএ-৫ পেয়েছে তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জনের সম্পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। বরং বিভিন্ন জিপিএ স্তরে শিক্ষার্থীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে শেখার মান, প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এবারের ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বেশিরভাগ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। গণিতেও অনেক বোর্ডে ফল তুলনামূলকভাবে খারাপ। যেহেতু এই দুটি বিষয় বাধ্যতামূলক, তাই এসব বিষয়ে খারাপ ফল সার্বিক পাসের হার কমিয়ে দিয়েছে বলে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন।

গ্রুপভিত্তিক ফলাফলেও বড় পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার সবচেয়ে কম, এবং এই বিভাগের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফলাফলকে শুধু ভালো বা খারাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়; পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ জিপিএ-৪ থেকে ৫-এর নিচে এবং মধ্যম স্তরে অবস্থান করছে—এটিও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, একদিকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি; বরং তারা মাঝামাঝি পর্যায়ের অর্জন নিয়েই উত্তীর্ণ হয়েছে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর সামর্থ্য বা ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় না। তাঁর মতে, সরকারের উচিত দ্রুত একটি বিস্তারিত ‘পোস্ট-রেজাল্ট অ্যানালাইসিস’ করা, যাতে কোন বিষয়ে, কোন অঞ্চলে ও কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে তা চিহ্নিত করা যায়। তিনি ইংরেজি, গণিতসহ দুর্বল বিষয়গুলোর জন্য বিশেষ সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, একাডেমিক সহায়তা ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।