সংবিধান সংশোধনের পথ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য চরমে পৌঁছেছে। সরকার বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকেই সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দেবে এবং তার ভিত্তিতে সংসদে অষ্টাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এই উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে বিরোধী শিবির। গত সোমবার কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাসের সময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। তাদের অনুপস্থিতিতেই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। কমিটিতে পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হয়েছে, কারণ বিরোধী দলকে নাম দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তারা কারও নাম দেয়নি। কমিটিতে বিএনপির আটজন সংসদ সদস্যের পাশাপাশি গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মো. অলিউল্লাহ অবশ্য জানিয়েছেন, তাকে না জানিয়েই কমিটিতে নাম দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে। তিনি গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করার সমালোচনা করেন। বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড়। গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকেই তারা সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। তাদের মতে, সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে নয়, বরং সংবিধানের মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। তাই তারা বিশেষ কমিটির পথে যেতে রাজি নন। সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, প্রথমে সংবিধান সংশোধন করা জরুরি এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত করা যেতে পারে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্যও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ২৯ এপ্রিল সংসদে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছিলেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের মতে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার টেকসই পরিবর্তন অসম্ভব। তিনি বিএনপিকে সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী করেন এবং অবিলম্বে পরিষদ গঠনের দাবি জানান। বিরোধী দলের নেতারা সংসদ ও রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনের পরিকল্পনা করছেন। জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে, তাই তৃণমূল পর্যন্ত আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। জামায়াত ও এনসিপিসহ বিরোধী জোট ‘সংবিধান সংস্কার’ হিসেবে এটিকে দেখছে, যা সাধারণ সংশোধনী নয়। এদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও বিশেষ কমিটি গঠনের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, সরকার জনগণের রায় উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রতারণা করছে। বিরোধের মূলে রয়েছে দুই ভিন্ন পথ—সরকার চায় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংশোধনী, অন্যদিকে বিরোধী দল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে।