পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালায় তুষারধসের ঘটনার পর নিখোঁজ বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী নির্মল পুরজার মরদেহ খুঁজে পেয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। রোববার দ্য আলপাইন ক্লাব অব পাকিস্তান নিশ্চিত করে যে, ব্রড পিক পর্বতের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৭০০ মিটার উচ্চতায় এই মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ওই স্থানে আরও তিনটি মৃতদেহ দেখতে পেলেও এখনও তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

চার দশক পেরোনো এই নেপালি বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ পর্বতারোহীর মৃত্যুর সংবাদ গত শনিবার প্রথম প্রকাশ করে তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এলিট এক্সপেডিশনস। সংস্থাটির বরাতে জানা যায়, প্রাণঘাতী ওই তুষারধসে নিহত ১০ জন অভিযাত্রীরই একজন ছিলেন নির্মল পুরজা। তাঁর মৃত্যুতে প্রিন্স অফ ওয়েলসসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন। নেপালে জন্ম নেওয়া পুরজা পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দীর্ঘ ১৬ বছর চাকরি করেন। ২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাসের কিছু বেশি সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ জয় করার কীর্তির মাধ্যমে তিনি বিশ্বম্ভর প্রতিশীতি অর্জন করেন।

এর আগে গত বুধবার ব্রড পিকের চূড়া অভিযানের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিল দশ সদস্যের একটি বহুজাতিক দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং পুরজা। আলপাইন ক্লাব অব পাকিস্তানের (এসিপি) তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দুপুরে তুষারধস আঘাত হানার পর তাদের সঙ্গে সকল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পুরজার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আরও তিন পর্বতারোহীর দেহ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল। নিহত ওই তিন আরোহী হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যালরি গেইস, ওমানের নাধিরা আহমেদ আবদুল্লাহ আল হারথি এবং নেপালের পুর বাহাদুর গুরুং।

এসিপির মুখপাত্র নায়লা কিয়ানি বিবিসির এক অনুষ্ঠানের বলেযান, 'আমাদের ধারণা, পুরো দলের সবাই মারা গেছেন।' তিনি নিজেও পুরজার নেতৃত্বাধীন একাধিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। কিয়ানি তার নেতৃত্বের গুণকীর্তন করে পুরজাকে 'অত্যন্ত দক্ষ ও নির্ভীক এক পর্বতারোহী' হিসবের আখ্যা দেন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, 'পাকিস্তানের কোরাম পর্বতশৃঙে নর্মল পুরজাসহ ছয় নেপালি ও চার বিদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো জাতিকে হতবাক কোরেছে। তাদের সাহসিকতা, মনোযোগ ও অবদানের কাহিনী চিরকাল অনুপ্রেরণা হিসেবে থাকবে।' নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে পুরজার বড় ভাই কামাল লেখেন, 'ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাচ্ছি, আমার প্রিয় ছোট ভাই নির্মল 'নিমসদাই' পুরজা এবং অন্যান্যএই যাত্রীরা এখন আর আমাদের সাথে নেই। হৃদয় ভেঙে গেলেও, তোকে নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। তোর কীর্তি কখানো ম্লান হবে না।'

একইভাবে শোকাহত প্রিন্স উইলিয়াম তাঁর মন্তব্যে উল্লেখ করেন, শ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী হওয়ার আগে একজন সেনা হিসবেও পুরজা অসামান্য সুনামের পরিচয় দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মন্তব্য করেন, 'নির্মল পুরজা সত্যিকারের এক অনুপ্রেরণা। তিনি দীর্ঘদিন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সেবা করেছেন এবং তাঁর চমকপ্রদ সব পর্বতাভিযানের ইতি গোটা বিশ্বের জানা।'

বিশ্বের দ্বাদশ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এই ব্রড পিকের উচ্চতা ৮,০৪৭ মিটার। সেখানেই গত বৃহস্পতিবারের তুষারধসের পর থেকে অভিযান শুরু করে পাকিস্তানি উদ্ধারকারী দল। মাঠপর্যায়ের সেই দলটি উদ্ধার করা দেহগুলো জাপানি বেজ ক্যাম্পে স্থানান্তর করবে বলে আলপাইন ক্লাব জানিয়েছে।

পুরজা ২০১৯ সালে আট হাজার মিটারের ওপর সব ১৪টি শৃঙ্গ মাত্র ১৮৯ দিনে জয় করে আগের রেকর্ড (যা ছিল সাত বছরের) চূর্ণবিচুর করে দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তার এই ঐতিহাসিক সফরের ভিত্তিতে দু বছর পর নেটফ্লিক্সে '১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইম্পসিবল' নামের এক প্রামাণ্যচিত্র মুক্তি পায়, যা তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তোলে। ওই অভিযান শেষে তিনি বলেছিলেন, 'ছয় মাস ছিল ভীষণ ক্লান্তিকর, কিন্তু ততোই বিনম্র করার মত একটি অভিজ্ঞতা। আমি বিশ্বাস করি, এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছি যে মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে যে কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব।'

দক্ষিণ ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ারে স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী এক কন্যা নিয়ে সংসার ছিল পুরজার। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চাকরিরত অবস্থায় তিনি এভারেস্ট বিজয়ী প্রথম গুর্খা হিসেবেও পরিচিতি পান। চরম উচ্চতার পর্বতাভিযানের জন্য ২০১৮ সালে তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে সম্মানসূচক 'এমবিই' উপাধিতে ভূষিত করেন। মৃত্যুর আগে নিজের শেষ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে পুরজা জানিয়েছিলেন, ব্রড পিক জয়ের কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না। প্রাথমিকভাবে শুধু গাশারব্রুম-২ শৃঙ্গে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু পাকিস্তান যাওয়ার আগে তিনি অনুভব করেন, এই সুযোগে ব্রড পিক জয় করতে পারলে অক্সিজেন ছাড়া ১৪টি আট হাজারি শৃঙ্গ দুবার জয়ের একমাত্র ব্যক্তির অনন্য রেকর্ড গড়তে তার কেবল আর একটি পর্বত বাকি থাকবে। ১৯৫৭ সালে অস্ট্রিয়ার এক দল প্রথমবারের মতো জয় করা এই বিখ্যাত এই শৃঙ্গটিতে ২০১৩ সালে সবচেয়ে প্রাণাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে কমপক্ষে ছয় পর্বতারোহী প্রাণ হারান।