পাবনা পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এখন নিত্যদিনের দুর্ভোগের নাম ভাঙাচোরা সড়ক আর জমে থাকা কাদাপানি। পৌরসভার সিংহভাগ রাস্তাই বড় বড় গর্তে পরিপূর্ণ, অন্যদিকে ধসে পড়া নিকাশী কাঠামোর ফলে অল্প বৃষ্টিপাতেও বিভিন্ন অঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নগরবাসীর চলাফেরায় চরম ভোগান্তি নেমে এসেছে, একইসাথে শহরের বাণিজ্যচক্রও স্থবিরতার মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আতাইকুলা সড়ক, হাসপাতাল সড়ক, দিলালপুর, রাধানগর, শালগাড়িয়ার তারক প্রামাণিক সড়ক এবং শিবরামপুরের বড় বাজার সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো গভীর খাদে পরিণত হয়েছে। মোটরসাইকেল, রিকশা ও অটোরিকশাসহ সকল ধরনের যানবাহন এসব পথ অতিক্রম করছে প্রবল ঝুঁকি সত্ত্বেও। কোনো কোনো সড়ক তো নালা-নর্দমা থেকে উপচে পড়া পানি আর আবর্জনায় এমন নোংরা অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাধ্য হয়েই সেসব মাড়িয়ে পথ চলতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও পাবনা পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা খাইরুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে তাঁরা পরিস্থিতি পর্যাবেক্ষণ করছেন। ড্রেনেজগুলো পরিষ্কার রাখার কাজ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে চেষ্টার কমতি নেই। একইসঙ্গে পুরাতন ড্রেনগুলোর মেরামত ও নতুন ড্রেন স্থাপনের প্রকল্পও আরম্ভ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনরুদ্ধারেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি দ্রুততার সাথে এই জটিলতা কেটে ওঠার ব্যাপারে প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
শালগড়িয়া মহল্লার এক বাসিন্দা আলো আক্তার তাঁর দৈনন্দিন কষ্টের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বর্ণনা করেন, বৃষ্টির পানি রাস্তা নিমজ্জিত করে ফেলার ফলে তাঁর সন্তানদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত মাশিবি এক তীব্র সংকটে রূপ নেয়। রিকশার প্রাপ্যতাও অনিশ্চিত হয়, আর পোশাক পরে এই ঘোলা পানি পেরিয়ে যাওয়াও শিশুদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
আতাইকুলা রুটের রিকশাচালক আনোয়ার হোসেন ইঙ্গিত দেন, জমে থাকা পানির গভীরে গর্তগুলো চোখে না পড়ায় প্রায়শই রিকশার চাকা অচল হয়ে যায় এবং ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে। পৌর শহরের নানা প্রান্তের দেড় ডজনেরও বেশি নাগরিকের সাথে আলাপ করে বোঝা যায়, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা হিসেবে তকমা পেলেও পাবনার নগরসেবার মান হতাশাদায়ক। রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এবং ময়লা-আবর্জনায় নালাগুলো অবরুদ্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি নেমে যেতে পারছে না। এর ওপর শহরের অনেক পুকুর ভরাট করে দালান গড়ে তোলা এবং পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ইছামতী নদী আবর্জনায় পূর্ণ হয়ে ওঠায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। কোনো অঞ্চলে বৃষ্টির পানি সরতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ব্যয় হয়, কিছু জায়গায় সমস্যা স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। এই দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছেন শিক্ষার্থী, চাকুরেদের ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।
শহরের কালাচাঁদ পাড়ার তেল মিল উদোক্তা আমিরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, কালাচাঁদ পাড়া-বড় বাজার সড়কটি নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। তবে এটি দীর্ঘ সময় ধরে মেরামতবিহীন থাকায় গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি বর্ষায় এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা একটি প্রত্যাশিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এতে কেবল পথচারীই নয়, মিলে পণ্যসংকুল ট্রাকও প্রবেশ করতে না পারায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্য এক বাসিন্দা মেহেদি খন্দকারের মতে, তাঁদের এলাকার রাস্তা ও নিকাশন ব্যবস্থা দীর্ঘকাল অরক্ষিত থাকায় তারা দৈনিক ভোগান্তির শিকার। ক্ষতিগ্রস্ত নালগুলোর জন্য পানি সরছে না। বৃষ্টি আরম্ভ হলেই সড়ক ডুবে থাকে এবং নালা থেকে জঞ্জাল উঠে এসে পথে ছড়িয়ে পড়ে, যা অতিক্রম করাই তাঁদের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান ইঙ্গিত দেন যে, নগরের বেহাল সড়ক ও বর্ষামুখর জলাবদ্ধতার আঘাতে বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে বড় আর্থিক চোট খাচ্ছে। তিনি এ-ও মন্তব্য করেন যে, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা থাকলেও পাবনায় চোখে পড়ার মতো কোনো উন্নয়ন চোখে পড়ে না।




