ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ মিলনায়তনে শনিবার (১৮ জুলাই) শহীদ ফারহান ফাইয়াজের স্মরণে 'আলোর পথযাত্রী' শীর্ষক এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাবের হোসেন, শহীদ ফারহানের পিতা শহীদুল ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সাদাত রহমান ও ফারহানের প্রাক্তন শ্রেণিশিক্ষক নজরুল ইসলাম।

শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পিতা শহীদুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জুলাই মাস এলেই শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অথচ বছরের বাকি সময়টায় কেউ তাঁদের খোঁজখবর নেয় না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাঁর সন্তান কি শুধু অন্যদের প্রদর্শনের জন্য জীবন দিয়েছে? তিনি স্পষ্ট জানান, তাঁরা এ ধরনের প্রদর্শনীতে অভ্যস্ত হতে চান না।

শহীদুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারের অবস্থা সম্পর্কে কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না। প্রধানমন্ত্রী নিজে বা তাঁর পক্ষ থেকে কেউ এখন পর্যন্ত তাঁদের দুঃখ-কষ্ট, হুমকি ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাননি। তিনি বলেন, এটা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক।

রাজনৈতিক ব্যক্তিরা শহীদদের পরিবারকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের 'ট্যাগ' দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শহীদ ফারহানের পিতা। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদেরা শহীদ পরিবারের সদস্যদের ডাকেন এবং তাঁরা বাধ্য হয়ে যান। সেখানে কেউ কেউ তাঁদের 'বিরোধী দলের' আবার কেউ 'সরকারি দলের' হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ট্যাগ দেওয়ার সংস্কৃতি শহীদ পরিবারের মানুষদের গভীরভাবে কষ্ট দেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তাঁর বক্তব্যে ফারহান ফাইয়াজকে প্রকৃত বীর হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই কতটা কঠিন, তা তিনি নিজেই জানেন। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, তরুণ প্রজন্ম যেভাবে বুক চিতিয়ে পুলিশ ও বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছে, সেই সাহসিকতা ও বীরত্ব চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাবের হোসেন বলেন, ফারহান ফাইয়াজের স্মৃতি শুধু শোকের নয়, এটি সাহস ও মানবিকতার উজ্জ্বল প্রেরণা। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা যেন ফারহানকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং দেশ ও মানুষের জন্য মানবিকতার শপথ নেয়।

স্মরণসভায় রক্তাক্ত জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা ও নিজের চোখ হারানোর গল্প শোনান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী সাদাত রহমান। তিনি ফারহান ফাইয়াজকে কলেজের নক্ষত্র ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করেন।

ফারহানের তৎকালীন শ্রেণিশিক্ষক নজরুল ইসলাম তাঁর আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে সরকারের কাছে দাবি জানান, ফারহানের গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়ার পেছনে যারা দায়ী, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক।

স্মরণসভায় কলেজের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কবিতা ও গান পরিবেশন করে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে রাপা প্লাজা ও জেনেটিক প্লাজার মাঝামাঝি স্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া (ফারহান ফাইয়াজ) বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।