মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ সম্প্রতি দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে একটি কঠোর বার্তা পাঠিয়েছে — অস্ত্র উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বাড়াতে তিন সপ্তাহের মধ্যে কার্যকর পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে যে সব গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষয় হয়ে গেছে, তা পূরণ করতেই এই জরুরি পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র শন পার্নেল শনিবার এক বিবৃতিতে জানান, ‘যুদ্ধবিমান ও সেনাদের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহের গতি বাড়াতে কাজ চলছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, হুমকির গতির সাথে তাল মিলিয়ে যুদ্ধসামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাত শুরুর আগে থেকেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এই তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলেও তাঁর দাবি।
প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ বুধবার শিল্পপ্রধানদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘বছরের পর বছর ধরে উন্নয়ন চক্র গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের এখনই কার্যক্রমের গতি দ্রুত করতে হবে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, এই চিঠিতে ‘গুরুত্বপূর্ণ সামর্থ্যের জন্য দ্রুততর এবং আরও আক্রমণাত্মক ডেলিভারি সময়সূচি’ প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি ইরানের সাথে যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরগুলোর মজুত আরও কমে গেছে বলে এক নতুন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে সংঘাত আবার শুরু হলে আমেরিকান সেনারা আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্যাট্রিয়ট এবং থাড ইন্টারসেপ্টরের কমে যাওয়া মজুতের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের বিমান প্রতিরক্ষা সংরক্ষণে আরও বড় ঝুঁকি নিতে হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা হয়েছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে কম সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে মার্কিন বাহিনী, যার ফলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভেদ করে ঢুকে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যাবে।
অস্ত্রের ঘাটতির খবর প্রকাশ্যে আসায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘প্রচুর পরিমাণে’ অস্ত্র মজুত রয়েছে। প্রয়োজনে আরও ‘বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরি করে পাঠানো হচ্ছে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে মুখপাত্র পার্নেল শনিবার নিশ্চিত করেছেন যে, ফেইনবার্গের এই চিঠি প্রকৃত সত্য এবং এটি ২০২৮ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে। কংগ্রেসে জমা দেওয়া এই বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকবে। সেই সাথে প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টার সাথেও এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রস্তাব নিয়ে কংগ্রেসে বর্তমানে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের ইরান বিরোধী সামরিক পদক্ষেপের ফলে ক্ষুব্ধ আইনপ্রণেতারা ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর হোয়াইট হাউসের অনুরোধে সাড়া দিতে চাইছেন না। গত বছর এই ব্যয় ছিল প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার।
সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ছিল, যা এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের সময় কমে দাঁড়িয়েছিল ১ হাজার ৩০টিতে। সাম্প্রতিক সংঘাতে তা আরও কমে এখন ৭৫৯ থেকে ৮২৭টির মধ্যে নেমে এসেছে। সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় এই সংখ্যা কমপক্ষে ৬৫ শতাংশ কম। থাড ইন্টারসেপ্টরের ক্ষেত্রেও একই চিত্র — যুদ্ধের আগে ছিল ৪৫২টি, এপ্রিলে যুদ্ধবিরতির শুরুতে তা কমে ২৩২ থেকে ২৬২টিতে দাঁড়ায়। পরে কিছু মজুত পূরণ হলেও তা এখন ২৩৪ থেকে ২৭৮টির মধ্যে রয়েছে, যা সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় কমপক্ষে ৩৮ শতাংশ কম।




