সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি নতুন ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট ট্রেন্ড ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে—ফাইবারম্যাক্সিং। ওজন হ্রাস, হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এমনকি ত্বকের উজ্জ্বলতার জন্য আঁশজাত খাবারকে জাদুকরী সমাধান হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কেবল ইনফ্লুয়েন্সাররাই নয়, বড় কোম্পানিগুলোও এখন সোডা, কুকিজ এবং কফির ক্রিমারের মতো পণ্যে ফাইবার মিশিয়ে বাজারে ছাড়ছে। কিন্তু এই প্রবণতা কি সত্যিই উপকারী, নাকি এটি কেবল আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হুজুগ?

ফাইবারম্যাক্সিং সহজ ভাষায় বলতে গেলে ডায়েটে প্রচুর পরিমাণে আঁশজাত উপাদান যোগ করার একটি পদ্ধতি। ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রায়শই দই, স্মুদি বা ওটসের সঙ্গে চিয়া কিংবা ফ্ল্যাক্স সিড মেশানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক রাবিয়া ডি লাটুর মন্তব্য করেন, চিকিৎসকরা বহুদিন ধরেই ফাইবার খাওয়ার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করছেন। এখন হ্যাশট্যাগের মাধ্যমে যদি আরও বেশি মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছায়, তবে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় যখন মানুষ এই ধারণাকে গেমের স্কোরের মতো ব্যবহার করতে শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট সুনানা সোহি এই ধরনের প্রবণতার মূলে একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেন। তাঁর মতে, মানুষ বুঝতে চায় না যে কেবল একটি নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর করেই সব স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য একক কোনো উপাদানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সঠিক পথ নয়। তিনি আরও যোগ করেন, এই ট্রেন্ডগুলোর আসল দুর্বলতা হলো মানুষের এই অতি-সরলীকরণ মনোভাব।

অতিরিক্ত ফাইবার গ্রহণের ক্ষতিকর দিকগুলোও উপেক্ষা করা যায় না। কিছু মানুষ সরাসরি পাউডার ফাইবার চামচে করে খাচ্ছেন, যা গলায় আটকে গিয়ে শ্বাসরোধের মতো মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। আবার কেউ কেউ ফাইবারের আশায় কলার খোসা বা কিউই ফলের লোমশ খোসা পর্যন্ত চিবিয়ে খাচ্ছেন—যা স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি নয়। তাই বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, পরিমাণ বাড়ানোর আগে এর ভালো ও খারাপ উভয় দিকই জানা প্রয়োজন।

খাবারের ফাইবার মূলত পরিপাকতন্ত্রের কার্যক্রম সুষ্ঠু রাখতে সহায়তা করে। এটি দুই ধরনের—অদ্রবণীয় ও দ্রবণীয়। অদ্রবণীয় ফাইবার হজম না হয়ে মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়; এটি মলের আকার বৃদ্ধি করে এবং পরিপাকতন্ত্র পরিষ্কার রাখে। অন্যদিকে দ্রবণীয় ফাইবার জেলের মতো আচরণ করে, অন্ত্রে খাবার হজমকে ধীর করে দেয়, যাতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে। এটি রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার কারণে ওজন কমাতেও এটি সহায়ক।

সাধারণত মহিলাদের জন্য দিনে ২৫ গ্রাম এবং পুরুষদের জন্য ৩৮ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে আমাদের মধ্যে অনেকেই এর অর্ধেক পরিমাণও গ্রহণ করেন না। তাই হুট করে উচ্চ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, প্রতি সপ্তাহে খাবারে মাত্র ৫ গ্রাম করে ফাইবার বাড়ানো যেতে পারে। না হলে পেটে গ্যাস বা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রাকৃতিক খাবারের ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় পাউডার বা গামির প্রচার থাকলেও ডা. সোহির মতে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত ফাইবারই সবচেয়ে ভালো। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম ও গোটা শস্য এর সেরা উৎস। তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের পেটের ব্যাকটেরিয়াগুলোরও নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে। তাই যত বেশি ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদজাত ফাইবার খাওয়া হবে, পেট তত বেশি সুস্থ থাকবে। সপ্তাহে অন্তত ৩০টি ভিন্ন উৎস থেকে ফাইবার নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে।

উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও নানা বিকল্প রয়েছে। সবজি হিসেবে সবুজ শাক, ব্রকলি বা গাজর; ফল হিসেবে অ্যাভোকাডো, আপেল, বেরি ও নাশপাতি; ডাল ও মটরশুঁটি; কাঠবাদাম, পেস্তা, চিয়া সিড ও ফ্ল্যাক্স সিড; এবং শস্য হিসেবে বার্লি, ওটস ও লাল আটা—এসবই খাদ্য তালিকায় রাখা যেতে পারে।

ফাইবার স্পঞ্জের মতো পানি শোষণ করে। সুতরাং যত বেশি আঁশজাত খাবার খাওয়া হবে, তত বেশি পানি পান করতে হবে। ফাইবার বৃদ্ধি করার পর যদি পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে শরীরে পানির ঘাটতি রয়েছে।

মোদ্দাকথা হলো, বড় বড় শব্দের পেছনে না ছুটে আগে প্রতিদিনের সাধারণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ তড়িঘড়ি করে ভালো কিছু করতে গেলে অনেক সময় উল্টো ফলই হতে পারে। সূত্র হিসেবে পপুলার সায়েন্স ও ভিটামিন সমাচারের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।