রাজধানীর মিরপুরের ফুটপাতগুলোতে টানা বৃষ্টির কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দিনভর বৃষ্টি আর মেঘলা আবহাওয়ায় গ্রাহকের সংখ্যা নগণ্য হলেও সংসারের চাকা সচল রাখতে তাঁরা দোকান খোলা রেখেছেন। নিজেদের আয়ের প্রায় পুরোটাই বৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে, তবু প্রতিদিন সকালে ফুটপাতে এসে হাজির হচ্ছেন তাঁরা।

মিরপুর-২ নম্বর সেকশনের বাংলাদেশ-জার্মান কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে ফুটপাতে একটি ছোট্ট দোকান আছে রানী বেগমের। সেখানে প্রতিদিন আটার রুটি, ডাল, সবজি আর ডিমভাজি বিক্রি করেন তিনি। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই দুপুরেও। চুলায় আগুন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না ক্রেতা না থাকায়। রানী বেগম জানান, বৃষ্টির কারণে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৭০ টাকার বিক্রি হয়েছে। অথচ ভালো দিনে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। গত শুক্রবার তো সারাদিন দোকানই খোলা হয়নি বৃষ্টির কারণে। তবে কোনো দিন দোকান বন্ধ রাখলে পরিবারের খাবার জোটে না। তিনি বলেন, ‘পেটে খিদা আসে। বৃষ্টি হইলেই কি, দোকান তো খুলতেই হইব। দোকান না খুললে খামু কী?’

যশোরের মনিরামপুর থেকে আসা রানী বেগম এখন মিরপুরের জনতা আবাসিক এলাকায় থাকেন। তাঁর পরিবারে আছেন স্বামী কাঞ্চন মিয়া, বৃদ্ধ মা ফাতেমা বেগম ও ছেলে সাজু মিয়া। স্বামী গত রমজানে স্ট্রোক করে এখন কাজে ফিরতে পারেননি। ছেলেরও স্থায়ী কাজ নেই। পুরো সংসারের দায়িত্ব প্রায় একার কাঁধেই তুলে নিয়েছেন রানী। প্রতিটি রুটি ১০ টাকা, ডাল বা সবজি ১০ টাকা আর ডিমভাজি ২০ টাকা দেন তিনি। স্বামীর ওষুধ ও মায়ের প্রেশারের ওষুধ মিলিয়ে মাসে প্রায় ৭০০ টাকা খরচ হয়। এমন অবস্থায় বৃষ্টি এলে তাঁর আয় আরও কমে যায়। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বলেন, ‘কষ্টের কথা ভাবলে তো চলবে না। যত দিন শরীরে শক্তি আছে, কাজ করতেই হবে। বেঁচে থাকতে তো কাজ করতে হয়।’

মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের ফুটপাতে একই চিত্র দেখা গেছে খোকন দাসের। তিনি জুতা মেরামত ও পলিশের কাজ করেন। একটি পুরোনো ছাতা মাথায় দিয়ে কাঠের পাটাতনে বসে থাকেন ক্রেতার আশায়। সকাল নয়টায় দোকান খুললেও বেলা দুপুর পর্যন্ত এক টাকাও আয় হয়নি। আগের দিন বিকেল পর্যন্ত কাজ হয়েছিল মাত্র ২২০ টাকার। ভালো দিনে তাঁর আয় ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত হয়, কিন্তু বৃষ্টির কারণে তা নেমে আসছে। তিনি বললেন, ‘আমগো তো দিনে দিনে কাম কইরা খাইতে হয়। দিন এরম থাকলে বাঁচমু কেমনে?’ খুলনার পাইকগাছা থেকে আসা খোকন প্রায় ২৮ বছর ধরে ঢাকায় ফুটপাতে কাজ করছেন। মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের এক ভবনের নিচতলার এক কক্ষের বাসায় স্ত্রী ও বড় মেয়ে থাকেন। স্ত্রী দেড় বছর ধরে বেকার। বড় মেয়ে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করে নিজের ভবিষ্যতের জন্য জমানো শুরু করেছেন। গ্রামে থাকা ছোট ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, তার খরচও বড় মেয়েই দেয়। খোকনের সামনে এখন বড় মেয়ের বিয়ের চিন্তা। তাঁর হিসাব অনুযায়ী সাধারণ বিয়েতেও আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা লাগবে। তাই অল্প অল্প করে সঞ্চয় করলেও আয় কমলে সেই টাকায় সংসার চালাতে হয়। তিনি বারবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আল্লাহই জানে আর কদিন এমন থাকব। ঘরে বসে থাকার উপায় নাই। সারা দিন বসেও খালি হাতে বাড়ি ফিরলে বড় কষ্ট হয়।’

রানী বেগম এবং খোকন দাসের মতো ফুটপাতের হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবনে বৃষ্টি এখন বড় অভিশাপ। সরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। সংসারের বাজার, ঘরভাড়া, ওষুধ আর সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই নির্ভর করে ফুটপাতে বসে করা এ ছোট্ট কাজের ওপর। বৃষ্টি থামলে তবে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করেন তাঁরা।