নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি ও কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নদীতীরবর্তী ২৯২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে ২৭৬টি শিল্প প্লট রয়েছে। ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর রপ্তানি আয় হয়েছে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে ৪৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু আছে; আরও ১০টি উৎপাদনে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে মোট শ্রমিকের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা করছে।
এই ইপিজেডে তৈরি হচ্ছে সেফটি জ্যাকেট, ব্লেজার, ইউরোপের নবদম্পতিদের জন্য বিশেষ ব্রাইডাল গাউন, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, সেফটি শু, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, লেজার প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিনের অপিসি ড্রাম এবং গাড়ির সিট কভারসহ নানা ধরনের পণ্য। এখানকার কারখানাগুলোতে টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল কর্স ও ভ্যান হিউসেনের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাকও তৈরি হয়। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখান থেকে ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে; এর আগের অর্থবছরেও রপ্তানির পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। উল্লেখ্য, দেশে একমাত্র ব্রাইডাল পোশাক তৈরির কারখানা এই ইপিজেডেই অবস্থিত।
শ্রমিকদের জীবনমানেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা তরুণী ফারজানা আক্তার বর্তমানে মাসিক ১৯ হাজার টাকা বেতন পাচ্ছেন; চাকরির শুরুতে তার আয় ছিল ৮ হাজার ২০০ টাকা। কদমতলীতে বসবাসরত এই নারী প্রতি মাসে চার হাজার টাকা মা-বাবার কাছে পাঠান। কাজের পরিবেশ অনুকূল হওয়ায় তিনি সাত বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে, ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারের কর্মী আসমা বেগম প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয় করেন; ছেলের পড়াশোনার খরচ ও স্বামীর সিএনজি মেরামতের প্রয়োজনে এই সঞ্চয় কাজে লাগান তিনি। একসময় যেখানে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছিলেন, আজ সেই একই স্থানে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে নতুন শিল্পের সঙ্গে।
কর্মপরিবেশের উন্নতির অংশ হিসেবে অনেক কারখানায় শ্রমিকদের শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা রয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠান টিএস টেক, যা গাড়ির সিট কভার তৈরি করে এবং যেখানে প্রায় ৪০০ শ্রমিক কাজ করেন, সেখানে ১৯ জন শিশুর দেখাশোনার জন্য একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র সাজানো হয়েছে; চারজন প্রশিক্ষিত নারী কর্মী তাদের যত্ন নেন। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক জানান, গর্ভধারণের পর থেকে কর্মীদের দুধ সরবরাহ করা হয় এবং কাজের সময় সার্বক্ষণিক চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা হয়। এছাড়া মাথায় সবুজ ফিতা পরিয়ে গর্ভবতী কর্মীদের সহজে চিহ্নিত করে বিশেষ সেবা দেওয়া হয়।
বিনিয়োগের দিক থেকেও এই ইপিজেড বৈচিত্র্যময়। ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৬টি বিদেশি, ৯টি দেশি-বিদেশি যৌথ এবং ১২টি দেশীয় বিনিয়োগকারীর মালিকানাধীন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কানাডা, চীন-হংকং, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, সিঙ্গাপুর, স্পেন, শ্রীলঙ্কা ও ইউক্রেনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ইউক্রেনের সুপার প্রটেকটিভ শু কোম্পানি এখানে নির্মাণ, কেমিক্যাল ও খনিশ্রমিকদের ব্যবহারের জন্য সেফটি জুতা তৈরি করে; এক হাজারের বেশি কর্মী এখানে নিয়োজিত। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক মো. আসলাম উদ্দিন জানান, নতুন বিনিয়োগের জন্য স্থানের সন্ধান চলছে; ১০ মিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ এখানে সম্ভব না হলে অন্যত্র জমি নেওয়ার কথা ভাবা হতে পারে।
এই অঞ্চলের ইতিহাসও উল্লেখযোগ্য। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী পরিবারের তিন ভাইয়ের উদ্যোগে ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আদমজী জুট মিল; ১৯৫১ সালে উৎপাদনে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকলে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর মিলটি জাতীয়করণ হয় এবং বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় আসে। কিন্তু দীর্ঘদিনের আর্থিক লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ২০০২ সালে বিশ্বব্যাংকের শর্তে মিলটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তখন কর্মরত ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান হারিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মিলের জমি ও স্থাপনার উৎপাদনমুখী ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৪ সালে জমি বেপজার কাছে হস্তান্তর করা হয়; পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী ইপিজেডের উদ্বোধন করেন। পাটের ঐতিহ্যের স্থলে আধুনিক শিল্পের সূচনা হয়, এবং নীরব শিল্পাঞ্চল আবার কর্মব্যস্ততায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া জানান, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্যের কারখানা গড়ে উঠছে এই অঞ্চলে। সরাসরি কাজে যুক্ত প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিকের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে আরও প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই ইপিজেডের সঙ্গে যুক্ত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, শিগগিরই এই সংখ্যা এক লাখের ঘর ছাড়িয়ে যাবে, যা দেশের রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরও বড় অবদান রাখবে।




