চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার এলএনজি আমদানির ওপর জোর দিলেও এ পদ্ধতিতে স্থায়ী সমাধান আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। রোববার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমানো নিয়ে সিপিডি আয়োজিত এক সংলাপে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, এলএনজি আমদানির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করলে আগামীতে গ্যাসের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে সরকার। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসনির্ভর ব্যবস্থার ওপর ভরসা না রেখে বিদ্যুতায়নের দিকে ঝুঁকতে হবে। কারখানাগুলোতে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যাবে বলে জানান তিনি। এ পদ্ধতিতে ১০ থেকে ১৭ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ।

অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সিপিডির পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গত বছরের শেষ দিকে দেশের ৩৫০টি তৈরি পোশাক কারখানার ওপর এই জরিপ চালানো হয়। সিপিডির প্রোগ্রাম সহযোগী সামি মোহাম্মদ জরিপের ফলাফল তুলে ধরেন।

জরিপে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ব্যাপক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা গেলে বছরে ২৫ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। তবে এ রূপান্তর বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রায় ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ।

গবেষণায় দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতের মোট যন্ত্রপাতির ৮৫ শতাংশই সেলাই বিভাগে ব্যবহৃত হয়। অথচ এই বিভাগে প্রযুক্তি বদলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সুযোগ মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে, কাটিং বিভাগে মোট যন্ত্রপাতির মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ ব্যবহার হলেও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে এই বিভাগ থেকেই মোট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ২৭ শতাংশের বেশি অর্জন সম্ভব।

অন্যদিকে, ওয়াশিং ও ডাইং বিভাগ সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ব্যবহার করে। শুধু বৈদ্যুতিক রূপান্তর বা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে এই তাপনির্ভর খাতের গ্যাসের বিকল্প চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। টেকসই বিকল্প হিসেবে ‘ইলেকট্রিক বয়লার’ ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে এটি অনেক ব্য�়বহুল। ফলে এই খাতে সরকার ভর্তুকি দিতে পারে বলে মত দিয়েছে সিপিডি।

সিপিডির প্রস্তাবিত জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি বাস্তবায়নে ৫০ শতাংশ কারখানার জন্য ৬ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা এবং শতভাগ বাস্তবায়নে ১৩ হাজার ২০৯ কোটি টাকা মূলধনি খরচের হিসাব দেওয়া হয়েছে। মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭১ শতাংশ লাগবে সবচেয়ে বড় ২৫ শতাংশ কারখানার ক্ষেত্রে, আর ক্ষুদ্রতম কারখানাগুলোর জন্য লাগবে মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ অর্থায়ন।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা ও এলএনজির বাজার অস্থিরতা কমাতে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জরিপের মডেল অনুযায়ী, ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কারখানাগুলোর গড় মাসিক জ্বালানি খরচ ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি অন্তত ৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে।

জরিপে সিপিডি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক বেশি সাশ্রয়ী কাটিং ও উচ্চ জ্বালানি ব্যবহারকারী ওয়াশিং বিভাগে বিদ্যুৎ-দক্ষ যন্ত্রপাতির জন্য নীতিগত ছাড় ও আর্থিক সহায়তা জোরদার করা। ছোট কারখানাগুলোর তারল্য সংকট মেটাতে সরকারি-বেসরকারি যৌথ অর্থায়ন ও ঋণদানের প্রক্রিয়া সহজ করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিং-ডাইংয়ের থার্মাল প্রক্রিয়া এবং সেলাই প্রযুক্তির বিদ্যুৎ খরচ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালানোর সুপারিশও এসেছে।