বিশ্ববাজারে সাশ্রয়ী মূল্যের পোশাক সরবরাহের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। তবে সম্প্রতি সেই কৌশল আর ফল দিচ্ছে না বলে ইঙ্গিত মিলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারের চলতি বছরের প্রথমার্ধের (জানুয়ারি–জুন) রপ্তানি পরিসংখ্যানে। কম দামে পোশাক রপ্তানি করেও বাজার হারাতে শুরু করেছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে বেশি দামি পোশাক রপ্তানি করে বাজার ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম এবং তাদের রপ্তানি আয় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউরোস্ট্যাটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইইউতে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরো রেখে রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম প্রতি কেজি পোশাক ২৯ দশমিক ৩২ ইউরো দরে বিক্রি করেছে এবং তাদের রপ্তানি বেড়েছে দশমিক ৩৬ শতাংশ। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ভিয়েতনামের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি হলেও এই দামের পার্থক্য রপ্তানি আয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইইউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৪১ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ কম। তবে জুন মাসে সামগ্রিক পোশাক আমদানি ৩ শতাংশ বেড়েছে বলে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। ২০১২ সাল থেকে ইইউর বাজারে চীনের পরেই দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ। এই সময়ে বাংলাদেশ ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম। ইইউর সামগ্রিক আমদানি হ্রাসের চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের হার অনেক বেশি, ফলে বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্বও কিছুটা কমেছে — ২২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে নেমে ২১ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা এই সময়ে ২ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। মূল্যের দিক থেকে রপ্তানি বাড়লেও পরিমাণের দিক থেকে তাদের রপ্তানি ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ কমেছে। অর্থাৎ, কম পোশাক বিক্রি করেও তারা গড়ে বেশি দাম পেয়েছে। গত বছরের প্রথমার্ধে ভিয়েতনামের প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ছিল ২৫ দশমিক ৮৪ ইউরো, যা চলতি বছর বেড়ে ২৯ দশমিক ৩২ ইউরো হয়েছে — এক বছরে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি। বিপরীতে, বাংলাদেশের প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ১৫ দশমিক ২৪ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৮৮ ইউরোয় দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি পরিমাণ ৮ দশমিক ২২ শতাংশ কমার পাশাপাশি দামও কমেছে, যার সম্মিলিত প্রভাবে মোট রপ্তানি আয় ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, ইইউর বাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস সব দেশে সমানভাবে প্রভাব ফেলছে না। কিছু প্রতিযোগী দেশ বেশি দামে পোশাক বিক্রি করে ভালো করছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য শুধু সস্তা পোশাক সরবরাহ করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইইউর বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখনো চীন, যার দখলে রয়েছে মোট আমদানির প্রায় ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও তাদের বাজার অংশ হ্রাস পেয়েছে, আর ভিয়েতনামের অংশ কিছুটা বেড়েছে। অন্যান্য বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর রপ্তানিও কমেছে, তবে বাংলাদেশের পতনের হার সবচেয়ে বেশি। ফলে গত এক দশকে চীনের সাথে ব্যবধান কমানোর যে প্রবণতা ছিল, তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

জুন মাসের পরিসংখ্যানে কিছুটা আশার আলো দেখা গেছে। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে, তবে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে। ফলে রপ্তানি মূল্য বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ। বিজিএমইএর পরিচালক শেখ এইচ এম মোস্তাফিজ জানান, তুলার (কটন) বাজার অস্থির থাকায় গত মৌসুমে কৃত্রিম তন্তুর (এমএমএফ) পোশাকের চাহিদা বেশি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের কারখানাগুলো মূলত কটনের পোশাক উৎপাদন করে, আর ভিয়েতনাম এমএমএফের পোশাক বেশি তৈরি করে, যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি, ভারতের সাথে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) কারণে অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ভারতীয় সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকছে, ফলে বাংলাদেশের কটনের পোশাকের অর্ডারও সেদিকে সরে যাচ্ছে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আগামী গ্রীষ্ম মৌসুমের অর্ডার দেওয়ার সময় এখনই, কিন্তু বাংলাদেশের কারখানাগুলো তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছে। এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ক্রেতারা অনিশ্চয়তার কারণে অর্ডার অন্য দেশে স্থানান্তর করতে পারেন।