রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি হোটেলে শনিবার সকালে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতি (বিসিএফএ) আয়োজিত ‘লং লিভ বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা জরুরি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে বাংলাদেশ চায় চীনের মতো একটি শক্তি পাশে থাকুক। মির্জা ফখরুলের ভাষ্য, ‘আমরা চাই যে চীনের মতো একটি শক্তি আমাদের পাশে থাকুক। অর্থনৈতিকভাবে থাকুক। চীনের প্রযুক্তি আমাদের লাগবে, চীনের সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন হবে।’
বিএনপির মহাসচিব আরও উল্লেখ করেন, চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। গত কয়েক দশকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে দেশটি যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ঐতিহাসিক এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও গভীর হয়েছে। স্বাধীনতার পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে এ সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায় এবং পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের আমলে তা আরও সম্প্রসারিত হয়।
দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা জরুরি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে চীনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০ কোটির এই দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ রয়েছেন, তাঁদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে চীনের প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমান বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতির বড় অংশ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যে চীনের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) অন্যতম বড় উৎস চীন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যঘাটতিও চীনের সঙ্গে। বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে চীন সরকারের আন্তরিক আগ্রহ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তথ্যমন্ত্রী। এ আগ্রহ ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন—দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভিত্তি বলে অভিহিত করেন তিনি। জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে অন্যরা নানা ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু চীনের এ আগ্রহ এবং আমাদের প্রয়োজন—এটাই দুই দেশের বন্ধুত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক ইউনিটি পয়েন্ট, পারস্পরিক স্বার্থের জায়গা।’
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সেরা অবস্থানে আছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এ সফরে রাজনৈতিক আস্থা, কৌশলগত যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরও জোরদার করা হয়েছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীন উন্নয়নের পথকে সম্মান করে এবং বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকতে চায় উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ককে ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ (কমিউনিটি উইথ আ শেয়ার্ড ফিউচার) পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বাজার আরও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সফরে বাংলাদেশ থেকে তাজা কাঁঠাল রপ্তানির প্রটোকল সই হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের আম চীনের বাজারে প্রবেশ করেছে। ভবিষ্যতে আরও কৃষিপণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে দুই দেশ একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিদেশি বিনিয়োগ অফিস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগ সহযোগিতা সহজ করবে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি কাজ এগিয়ে নিতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে ইয়াও ওয়েন বলেন, সংকট সমাধানে চীন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে চীন কাজ করতে প্রস্তুত। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর সফরে অর্জিত সমঝোতাগুলো বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি নজমুল হক নান্নু। আরও বক্তব্য দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস প্রমুখ।


