আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে আজ শুক্রবার সকালে দামে সামান্য পতন দেখা গেছে। পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ব্রেন্ট তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৯.৫৩ ডলারে নেমে এসেছে, যা গতকালের তুলনায় ৭৫ সেন্ট কম। তবে এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় দাম এখনো ২২ ডলার ৩০ সেন্ট বেশি। গত মাসের তুলনায় দাম ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৩৩ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। গতকাল প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ৯০ দশমিক ২৮ ডলার।
তেলের বাজারের এই ওঠানামার পেছনে প্রধানত সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যই নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। তবে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা বা বড় ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা বাড়লে দামের গতিপথ দ্রুত বদলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে তেলের দাম কত হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে পূর্বাভাস দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
ভোক্তাপর্যায়ে জ্বালানির দাম নির্ধারণে অপরিশোধিত তেলের দামই মুখ্য ভূমিকা রাখে। তবে পাম্পে বিক্রি হওয়া পেট্রোল বা ডিজেলের দামের মধ্যে অপরিশোধিত তেল ছাড়াও পরিশোধন, পরিবহন, কর এবং পরিবেশকদের মুনাফার অংশ অন্তর্ভুক্ত থাকে। অপরিশোধিত তেলের দাম যখন বাড়ে, তখন জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ে; কিন্তু দাম কমলে জ্বালানির দাম তুলনামূলক ধীরগতিতে কমে। এই প্রবণতাকে অনেক সময় 'রকেটস অ্যান্ড ফেদারস' নামে অভিহিত করা হয়।
জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে, যা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ নামে পরিচিত। দুর্যোগ, নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই মজুতের মূল উদ্দেশ্য। তবে সরবরাহে ধাক্কা লাগলে দামের তীব্র উত্থান রোধ করতেও এই মজুত কাজে আসে। এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বরং অস্থায়ী ভরসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যাতে ভোক্তা ও জরুরি পরিষেবাগুলো কিছুটা স্বস্তি পায়।
অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস — দুটোই দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। ফলে তেলের দামে বড় পরিবর্তন আসলে প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, তেলের দাম বেড়ে গেলে অনেক শিল্প কারখানা যেখানে সম্ভব সেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়।
ঐতিহাসিকভাবে তেলের দাম কখনো স্থির ছিল না। প্রধানত দুটি বেঞ্চমার্কের মাধ্যমে তেলের বাজার পরিমাপ করা হয় — ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)। বিশ্বব্যাপী লেনদেনের বড় অংশের মূল্য নির্ধারণ হয় ব্রেন্টের ভিত্তিতে, তাই এটিকে বৈশ্বিক তেল বাজারের সবচেয়ে ভালো সূচক হিসেবে ধরা হয়। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও এখন তাদের বার্ষিক পূর্বাভাসে ব্রেন্টকেই প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে।
ব্রেন্ট বেঞ্চমার্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ইয়ম কিপুর যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিলে প্রথম বড় ধাক্কা আসে। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন অ-ওপেক উৎপাদকদের বাজারে প্রবেশের কারণে দাম কমে যায়। ২০০৮ সালে বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধিতে দাম আবার চূড়ায় ওঠে, তবে পরবর্তীতে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে তা ভেঙে পড়ে। ২০২০ সালে কোভিড মহামারির সময় তেলের চাহিদা ধসে পড়ে এবং দাম প্রতি ব্যারেল ২০ ডলারের নিচে নেমে যায়। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, যুদ্ধ, মন্দা, ওপেকের সিদ্ধান্ত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতি — সবকিছুই তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম নির্ধারণে প্রশাসনের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আর্কটিক ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজের উপকূলীয় সমভূমিতে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য ১৫ লাখ একরের বেশি জমি খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়, যা আগের প্রশাসনের সীমিত নীতির বিপরীত ছিল। অপরিশোধিত তেলের দাম দিনের বেলায় একাধিকবার বদলাতে পারে, বিশেষ করে ফিউচার মার্কেট খোলা থাকাকালীন সময়ে। এই বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতারা ভবিষ্যতে তেল সরবরাহের চুক্তি করেন, ফলে লেনদেন চলতে থাকলে দামও বদলাতে থাকে। মার্কিন শেল তেল উৎপাদন বাড়লে দেশীয় সরবরাহ বেড়ে যায়, যার ফলে দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তেলের দাম বেশি হলে সাধারণত দৈনন্দিন পণ্যের দামও বেড়ে যায়। কারণ, জ্বালানি খরচের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন খরচও বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে মুদি দোকানের তাক পর্যন্ত পৌঁছানো পণ্যের দামে।




