মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত থেরাপিস্টদের কাজ অত্যন্ত চাপপূর্ণ ও জটিল প্রকৃতির। সীমিত সময়ের মধ্যে অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে মানবিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের মধ্যে জ্ঞানগত ভুল বা পক্ষপাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষজ্ঞরাও দৈনন্দিন জীবনের মতো একই ধরনের ভুল করতে পারেন। এই ভুলগুলো সেশনের আগে, চলাকালীন বা পরবর্তী সময়ে—যেকোনো পর্যায়ে ঘটতে পারে।
সেশনের পূর্বে একজন থেরাপিস্ট যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয়ে অটল হয়ে থাকেন, তাহলে সেটি একটি পূর্ব-সেশন ভুল হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তিনি ক্লায়েন্টের বক্তব্যকে কেবল সেই পূর্বনির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করতে থাকেন। সেশনের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ভুলগুলোর একটি হলো ‘মাইন্ড-রিডিং’ বা মনের কথা পড়ে ফেলা; যেখানে ক্লায়েন্টের সাধারণ কোনো বক্তব্য থেকে থেরাপিস্ট অতিরিক্ত অনুমান করে বসেন এবং ক্লায়েন্টের প্রকৃত অনুভূতি বা উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হন। আবার সেশন শেষ হওয়ার পর নোট প্রস্তুতের সময় ‘ন্যারেটিভ ফ্যালাসি’ দেখা দিতে পারে—অর্থাৎ থেরাপিস্ট অস্পষ্টতা ও অনিশ্চয়তা কমিয়ে একটি কৃত্রিম সুসংগত গল্প তৈরি করেন যা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
ড. এইচ. পল পুটম্যান তৃতীয়ের ‘স্পেশাল রিপোর্ট: অ্যাড্রেসিং কগনিটিভ এরর ইন সাইকিয়াট্রিক প্র্যাকটিস’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থেরাপিস্টরা দ্রুত রোগ নির্ণয় এড়িয়ে বহুমুখী মূল্যায়ন পদ্ধতি অবলম্বন করলে, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রতিক্রিয়া নিলে এবং যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি করলে এই ধরনের ভুল কমানো সম্ভব। তবে এর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিও এখন একটি কার্যকর ও পরিপূরক উপায় হিসেবে উঠে আসছে।
জেনারেটিভ এআই ও বড় ভাষা মডেল (এলএলএম) এখন থেরাপিস্টদের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এআই সেশনের ট্রান্সক্রিপ্ট বিশ্লেষণ করে নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত, মনের কথা পড়ে ফেলা বা অতিসাধারণীকরণের মতো সম্ভাব্য ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পারে। তবে এ জন্য প্রম্পটের ভাষা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হয়, যাতে এআই-এর মন্তব্য অভিযুক্তিমূলক না হয়ে সহযোগিতামূলক হয়। কারণ থেরাপিস্টকে রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিলে পরবর্তী আলোচনা ফলপ্রসূ হয় না; বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত সহকর্মীর মতো মূল্যায়ন।
বর্তমানে চ্যাটজিপিটি, ক্লদ, জেমিনি ও গ্রক-এর মতো সাধারণ এলএলএমগুলো মানব থেরাপিস্টের সমতুল্য নয়। বিশেষায়িত মডেলগুলো এখনও উন্নয়ন ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। তবুও এআই এখন থেরাপি প্রক্রিয়ার তিনটি ধাপেই—প্রস্তুতি, সেশন ও পর্যালোচনা—ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষকরা মনে করছেন, প্রচলিত থেরাপিস্ট-ক্লায়েন্ট দ্বৈত সম্পর্ক এখন ধীরে ধীরে থেরাপিস্ট-এআই-ক্লায়েন্ট ত্রৈত সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে।
থেরাপিস্টদের অনেকেই এআইকে উপেক্ষা করতে চান, কিন্তু বাস্তবতা হলো ক্লায়েন্টরা এখন সেশনে এআই-উৎপন্ন পরামর্শ নিয়ে আসেন এবং সেশন শেষে থেরাপিস্টের বক্তব্য যাচাই করতে এআই-এর সাহায্য নেন। তাই এআই-এর উপস্থিতি উপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত নয়। জেমস গারফিল্ডের একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে—‘সত্য তোমাকে মুক্ত করবে, কিন্তু প্রথমে তোমাকে কষ্ট দেবে।’ এই প্রেক্ষাপটে এআই-কে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
জনসাধারণের মধ্যে এআই-এর ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছেন; চ্যাটজিপিটির একাই সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা একশ কোটিরও বেশি, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ নেন। আগস্ট মাসে ওপেনএআই-এর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল, যেখানে এআই-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবের অভিযোগ তোলা হয়। এআই কখনো কখনো বিভ্রম তৈরি করতে বা অনুপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, সব বড় এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকেই একসময় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবে জবাবদিহি করতে হতে পারে।
জ্ঞানগত ভুল শনাক্ত করা সহজ কাজ নয়। এটি কোনো গাণিতিক ভুলের মতো স্পষ্ট নয়; বরং এটি সূক্ষ্ম ও অস্পষ্ট হতে পারে। তাই কোনো মানব পর্যালোচকও ভুল চিহ্নিত করার দাবি করলে তা যাচাই করা প্রয়োজন। থেরাপিউটিক প্রেক্ষাপটে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া উচিত নয়। বরং সম্ভাব্য ভুলটি নিয়ে থেরাপিস্টের সঙ্গে শান্তভাবে আলোচনা করাই সর্বোত্তম পন্থা।
তিনটি নমুনা উদাহরণে দেখা গেছে, পোস্ট-সেশন মূল্যায়নে এআই ট্রান্সক্রিপ্টের নির্দিষ্ট অংশ চিহ্নিত করে সম্ভাব্য জ্ঞানগত ভুলের ইঙ্গিত দিতে পারে। যদিও এআই-এর চিহ্নিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত নয়; এগুলো নিয়ে আরও গভীর আলোচনা ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। প্রম্পট ডিজাইনেও বিশেষ যত্ন নিতে হয়—যদি নির্দেশনা স্পষ্ট না হয়, তাহলে এআই অপ্রাসঙ্গিক ও বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য ভুল চিহ্নিত করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী এখন মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি বিশাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এআই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহজলভ্য ও সস্তা উপায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নির্দেশনা দিচ্ছে। এর দ্বৈত প্রভাব রয়েছে—একদিকে এটি ক্ষতিকর হতে পারে, অন্যদিকে এটি শক্তিশালী সহায়কও হতে পারে। থেরাপিস্টদের উচিত এআই-কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করা; একে নির্ভুল হিসেবে না ধরে, বরং একটি সংবেদনশীল সরঞ্জাম হিসেবে গ্রহণ করা। এতে চিকিৎসা অনুশীলনের গুণগত মান উন্নত হতে পারে, তবে সর্বদা মানবিক বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করতে হবে।




