বলিউড তারকা অর্জুন কাপুর বরাবরই নিজের শারীরিক গঠন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং অতিরিক্ত ওজনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প অকপটে বলেছেন। সর্বশেষ এক আলাপচারিতায় তিনি ব্যক্ত করেন, জীবনের সবচেয়ে বড় রূপান্তরটি তার দেহে নয়, মননে ঘটেছে। এক সময় চলচ্চিত্রের চাহিদা বা দর্শক-প্রত্যাশা মেটাতে তিনি শরীরচর্চা করতেন, কিন্তু বর্তমানে নিজের প্রশান্তি ও সুস্বাস্থ্যই তার ব্যায়ামের চালিকাশক্তি।

অর্জুন কাপুরের ভাষায়, তার শারীরিক প্রক্রিয়া অনেকের তুলনায় ধীরগতির। কেউ তিন মাসে যে অগ্রগতি সাধন করে, তার ক্ষেত্রে তা ছয় মাস সময় নেয়। পূর্বে এ নিয়ে নিরাশা এলেও পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন, ভিন্ন একজনের সময়সীমাকে নিজের সাফল্যের মাপকাঠি ভাবা যাবে না। তিনি স্মরণ করেন, প্রতিটি সিনেমার আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওজন কমানোর যে চাপ থাকত, তা শরীরচর্চার আনন্দ কেড়ে নিত। শুটিং শুরুর আগে নিজেকে সেরা অবস্থায় উপস্থাপনের চাপেই ফিটনেস আর উপভোগ্য হতো না, বরং দেহ যেন তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া করত।

গত কিছু বছরে অভিনেতা প্রায় ৫০ কেজি কমিয়েছিলেন। পরে কিছুটা ভর ফিরে আসে, তবে তিনি আবারও প্রায় ২০ কেজি হ্রাস করতে সক্ষম হন। অর্জুনের মতে, বলিউডে আসার পর দর্শকের প্রত্যাশা পূরণের চাপ থেকেই ওজন নিয়ে নতুন করে সংগ্রাম শুরু হয়। তিনি জানান, এবছর ফিটনেসের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না, কেবল নিজের তৃপ্তির জন্যই তিনি ব্যায়াম করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে।

অর্জুনের ধারণা, সুস্থ জীবনের অন্যতম মূল উপাদান হলো প্রয়োজনে 'না' বলার দক্ষতা। অতীতে নিজের সময়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে স্বাধীনতা ভাবলেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন, অতিরিক্ত স্বাধীনতা অনেক ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলাহীনতায় রূপ নেয়। যখন ইচ্ছে জাগরণ, যখন খুশি কাজ করা— এগুলো ধীরে ধীরে অলসতায় পর্যবসিত হয়। এখন তাই সকালেই শরীরচর্চা সেরে ফেলেন, কেননা এতে সারা দিনের জন্য একটি ছন্দ তৈরি হয় এবং পরবর্তী ব্যস্ততার মাঝেও মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়।

শুধু দৈহিক অনুশীলন নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটিতেও এক বড় পরিবর্তনের কথা জানান অভিনেতা। 'থেরাপি এখন আমার জীবনের এমন একটি অঙ্গ, যা কখনওই বাদ দিই না,' বলছেন তিনি। তার ভাষ্যে, একাকিত্ব এখন আর ভীতির কারণ নয়; বরং বন্ধু, বোন এবং নিজেকে সময় দেওয়ার মাঝেই মানসিক স্থিতাবস্থা খুঁজে পেয়েছেন। গত এক বছরে কাজের ফাঁকে নিছক আনন্দের জন্য আমস্টারডাম, ভিয়েনা, ভেনিস, লন্ডন, গোয়া ও দেরাদুনের মতো নানা গন্তব্যে ভ্রমণ করেছেন। আগে ছুটি নেওয়াকে বিলাসিতা মনে হলেও এখন প্রয়োজন অনুভব করলে দীর্ঘ দশ দিনের জন্য কাজ থেকে দূরে থাকতে দ্বিধা করেন না।

অর্জুন কাপুর পূর্বেও জানিয়েছিলেন, ১৬ বছর বয়সে তার ওজন ১৫০ কেজিতে পৌঁছায়। বলিউডে পদার্পণ করতে প্রায় চার বছরের কঠোর পরিশ্রমে তিনি প্রায় ৫০ কেজি কমান। গত বছর এক অনুষ্ঠানে তার ব্যাখ্যা ছিল, ওজন হ্রাসের ওই প্রক্রিয়াটি যতটা শারীরিক সংগ্রাম ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশিখানি ছিল মানসিক যুদ্ধ। নব্য প্রজন্মের প্রতি তার পরামর্শ, মানসিক সুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং শক্তির পরিচায়ক।

আগে বম্বে টাইমসকে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে অর্জুন উল্লেখ করেন, তার স্থূলতা নিছক মেদবৃদ্ধির সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি স্বাস্থ্যগত জটিলতা। বলিউডে টিকে থাকার চাপ, শারীরিক গঠন নিয়ে নিন্দা এবং সবসময় নিজেকে প্রতিপন্ন করার তাড়না অনেককেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। তার কথায়, এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রাসঙ্গিক থাকার চাপ অনেক বেশি; বাইরে থেকে হয়তো হাসিমুখ দেখাতে হয়, কিন্তু ভেতরে ব্যক্তি চূর্ণবিচূর্ণ হতে পারে, তার ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে। অর্জনের বিশ্বাস, ফিটনেসের অর্থ শুধু ওজন হ্রাস নয়; বরং দেহ ও মনের মধ্যে একটি টেকসই সাম্য রচনা করা। আর সেই পথেই এখন তার যাত্রা।