১৯৮২ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়কার একটি স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, তৎকালীন নাগেশ্বরী এলাকায় যাতায়াতের মূল মাধ্যম ছিল কাঠের চাকার গরু-মহিষের গাড়ি, রিকশা ও জং ধরা সাইকেল। মোটরসাইকেল দেখা যেত খুব কমই। সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে পাড়ি দিতেন, আর বর্ষার দিনে ভেলা কিংবা নৌকাই ছিল একমাত্র ভরসা। বাস বা ট্রেন ছিল যেন রূপকথার গল্প। ঢাকা বা রংপুর যেতে হলে প্রথমে ধরলা নদীর পাটেশী ঘাটে পৌঁছাতে হতো হেঁটে অথবা রিকশায়। সেখান থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে কুড়িগ্রাম গিয়ে তবে বাস বা ট্রেনে উঠার সুযোগ মিলত। নাগেশী থেকে তদানীন্তন জেলা সদর রংপুর পৌঁছাতে সময় লেগে যেত প্রায় এক দিন এক রাত। এলাকায় এতই একটি কথা প্রচলিত ছিল, ‘যাই যায় রমপুর, তাই যায় যমপুর।’ যাঁরা কদাচিৎ রংপুর বা ঢাকা গিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে বাস বা ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতার গল্প অমনোযোগী শ্রোতার মতো শুনতাম বলে জানান রচয়িতা।

একদিন খবর ছড়িয়ে পড়ল, কুড়িগ্রাম সদরের ইট ও আড়তের কাজে পরিচিত গেন্দু মিয়া পাটেশী-ভূরুঙ্গামারী রুটে একটি বাস নেমেছেন। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বের এই পথে ভাড়া ধার্য হয় ১০ টাকা। ডিজেলচালিত সে বাসের স্টার্ট দিতে হ্যান্ডেল ঘোরানোর প্রয়োজন হতো, যা গ্রামের মানুষদের কাছে এক অভাবনীয় দৃশ্য হয়ে ধরা দিয়েছিল। ছোট-বড় সবাই ছুটে গিয়েছিল সেই আজব গাড়িটি দেখতে। স্কুল থেকে ফেরার পথে লেখক ও তাঁর চার বন্ধু—লুৎফর, কাশেম, রূপাতন— সিদ্ধান্ত নিলেন, সামনের শুক্রবারে ব্যাপারী হাটের বাজারে গিয়ে গেন্দু মিয়ার বাসটি সরাসরি দেখবেন।

শুক্রবার সকালের নাস্তা করে রওনা দিয়ে তারা বিশাল আউশ ধানের মাঠের মধ্যে দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ ধরে হাঁটতে থাকেন। মাঠে কৃষকেরা আগাছা পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিলেন। একজন কৃষক তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেন বাস দেখতে যাচ্ছেন। সেই কৃষক গাড়টির বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়ে বললেন, ‘ডিজল দিয়া চলে, হ্যান্ডেল ঘুরাইয়া স্টার্ট দিতে হয়। জীনেরও এমন শুনি নাই।’ এসব কথায় কৌতূহল আরও বহুগুণে বেড়ে গেল। প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটার পর ব্যাপারী হাটে পৌঁছে জানতে পারলেন, বাসটি একঘন্টা আগেই বাজার ছেড়ে গিয়েছে। মুহূর্তে আশা নিভে গেলেও বন্ধু রূপাতনের প্রচণ্ড জেদের কাছে হার মানতে হয় সেদিন। বাকি সকলে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সূর্য মাথার ওপর চড়ার আগেই বাজারে জড় হতে শুরু করলো বাস দেখার কৌতূহলী মানুষের ভিড়।

হঠাৎই ভেসে এলো হর্ণের আওয়াজ। ‘এ বাস আইসচে রে, বাস আইসচে’ বলে সকলে চিৎকার করে ওঠে। ধুলা উড়িয়ে এসে থামে একটি রংচটা ছোট্ট মিনিবাস। এর ভাঙা কাঁচের জানালা আর হেলপারর ‘ব্যাপারী হাট, ব্যাপারী হাট’ বলে যাত্রী নামানোর দৃশ্যটি মুগ্ধতার সৃষ্টি করে। কন্ডাক্টর বাঁ হাতের আঙুলের ভাঁজে ১, ৫, ১০ ও ২০ টাকার নোট পুরে স্মার্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হেলপারকে একটি ৫ টাকার নোট দিয়ে চালকের জন্য পান-সিগারেট আনতে বলা হলো। রচয়িতা ও তার বন্ধুরা চরম উত্তেজনা নিয়ে বাসটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন— কাঠের সিট, লোহের হাতল এবং ইঞ্জিন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে বের হওয়া কালো ধোঁয়া। রূপাতনই সবার আগে ইঞ্জিনের খোলসে হাত ছোঁয়ায়, তাতে তা গরম লাগে ও মৃদু কাঁপছিল। হেলপার যাত্রীদের ডাকার পর পাঁচ-ছয়জন আরোহী নিয়ে বাসটি আবারও বিকট হর্ণ বাজিয়ে ধুলা উড়িয়ে ছুটতে লাগল। লেখকরা দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য অবাক চোখে দেখতে থাকেন।

সময়ের বিবর্তন উল্লেখ করে লেখক বলেন, ২০০৩ সালে ধরলার ওপর সেতু নির্মিত হওয়ায় এবং ভূরুঙ্গুামারী থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত ডাবল লেন পাকা সড়ক তৈরি হওয়ার পর এখন প্রতিদিন শত শত যানবাহন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করে। এসব আধুনিক বাসের ঝকঝকে রং ও অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। বিশেষত রাতের বেলায় বাসগুলোর লাল, হলুদ ও সবুজ আলোর মিছিল এক ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করে। তারপরও, জীবনের প্রথম দেখা গেন্দু মিয়ার সেই হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে চালু হওয়া বাস দেখার গভীর অনুভূতি ছিল অনন্য ও একান্ত নিজস্ব।