ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠে লিওনেল মেসির গতিবিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী এই তারকাকে ম্যাচের বেশিরভাগ সময় হাঁটতে বা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার এই আচরণকে অনেকেই অলসতা হিসেবে দেখলেও, পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষকরা বলছেন এটি মেসির সুপরিকল্পিত কৌশল।
ফিফার উপাত্ত অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে মেসি মোট দৌড়েছেন ৩৫ হাজার ৮৬৮ মিটার। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ সময়, অর্থাৎ ২২ হাজার ৯৫৮ মিটার, তিনি কাটিয়েছেন ঘণ্টায় ০ থেকে ৭ কিলোমিটার গতিতে—যা মূলত হাঁটা বা খুবই ধীরগতির চলা। অন্যদিকে, বিশ্বকাপের অন্যান্য শীর্ষ ফরোয়ার্ডদের সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য স্পষ্ট। হ্যারি কেইন ৬০০টি, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ৫১৪টি, উসমান দেম্বেলে ৪৭৭টি এবং মিকেল ওইয়ারসাবাল ৪৬১টি তীব্র গতির দৌড় দিয়েছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পেও ৩৩৬টি হাই স্পিড রান করেছেন। আরলিং হলান্ড ৩১৪টি নিয়ে মেসির সবচেয়ে কাছাকাছি থাকলেও নরওয়ের তৃতীয় ম্যাচে তিনি মাত্র এক মিনিট খেলেছেন।
এর আগে কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে একটি পরীক্ষা চালিয়েছিল ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ। দ্বিতীয়ার্ধের একটি নির্দিষ্ট ১৫ মিনিটের স্পেলে তারা মেসির দৌড়ানোর সময় মাপে। দেখা যায়, ওই ১৫ মিনিটে মেসি মাত্র ৫১ সেকেন্ড দৌড়েছেন। পুরো ৯০ মিনিটের হিসাবে যা প্রায় ৫ মিনিটের কাছাকাছি। এই পরীক্ষা পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক না হলেও এটি প্রমাণ করে যে মেসি প্রতিপক্ষের তুলনায় অনেক কম দৌড়ান।
মেসির এই পদ্ধতি সফল হওয়ার পেছনে দুটি মূল কারণ রয়েছে। প্রথমত, খেলা পড়ার তার অসাধারণ ক্ষমতা। বলের গতিপথ ও প্রতিপক্ষের অবস্থান সম্পর্কে তার পূর্বাভাস অত্যন্ত নির্ভুল। দ্বিতীয়ত, সতীর্থদের নিঃস্বার্থ পরিশ্রম। আর্জেন্টিনার অন্য দশজন আউটফিল্ড খেলোয়াড় বোঝেন যে তাদের মেসির জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে। তারা মাঠের প্রতিটি ইঞ্চি কভার করে, যাতে মেসি নিজের শক্তি সঞ্চয় করে সঠিক মুহূর্তে বিস্ফোরক হতে পারেন। এই কারণেই মেসি প্রতি ৯০ মিনিটে গড় দৌড়ের হিসাবে একেবারে নিচে থাকলেও গোলসংখ্যায় এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন।
তবে প্রয়োজনে মেসি তার স্বাভাবিক ধীর গতি ছেড়ে দ্রুতগতির খেলায় রূপ নিতে পারেন। মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচটি তার উদাহরণ। আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়লে, ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে মেসিকে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। ৭৬ মিনিটের পর থেকে তিনি ম্যাচের সবচেয়ে বেশি টাচ, শট, ড্রিবল ও সুযোগ তৈরি করেন। যেন সঞ্চিত সমস্ত শক্তি একসঙ্গে মুক্ত করে দিয়েছেন। তবে এটি প্রতিদিনের ঘটনা নয়। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মেসি আবার তার ধীর, স্থির ও অপেক্ষমাণ কৌশলে ফিরতে চাইবেন, যেখানে তিনি শুধু প্রয়োজনীয় মুহূর্তগুলোতে জীবন্ত হয়ে ওঠেন, যেমন কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম গোলের মুহূর্তটি।
এই কৌশলই মেসিকে অন্যান্য খেলোয়াড়দের থেকে আলাদা করে। শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল ও সঠিক সময়ে সঠিক অবস্থান নেওয়ার ক্ষমতাই তাকে বিশ্বসেরা করে রেখেছে।




