যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। শনিবার দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে এবং যেকোনো সময় তা আরও অবনতি হতে পারে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সজাগ থাকার পাশাপাশি নিকটস্থ মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সতর্কবার্তায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট বাতিল ও মাঝে মাঝে আকাশপথ বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যাহত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো বিশ্বের যেকোনো স্থানে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা বা মার্কিন নাগরিকদের টার্গেট করে হামলা চালাতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এই সতর্কতা জারির কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, গত শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার সময় দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে এ নিয়ে সরকারি হিসাবে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। নিহত সেনাদের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘ সময় কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য না করলেও পরে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানান।

এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের নির্দেশনায় সেন্টকম নতুন করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, মার্কিন সেনাসদস্যদের মৃত্যুর জন্য দায়ী বাহিনীকে দ্রুত শাস্তি দিতেই এই হামলা চালানো হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রাতে কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাস ও সিরিক এলাকায় কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, তবে আগের সাত রাতের তুলনায় এবার হামলার তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

ইরানি সংবাদমাধ্যম আরও জানায়, চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র বড় পরিসরে আবার হামলা শুরু করার পর থেকে তেহরান প্রায় প্রতিদিনই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ওমান, ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘাঁটি ও স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গতকাল এক বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন ‘শিক্ষা’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না। এর আগে তেহরান সতর্ক করে বলেছিল, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার মূল্য পুরো অঞ্চলকেই দিতে হবে।

অন্যদিকে, ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুন থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ৫০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০০ জনের বেশি। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রথম দফার হামলায় ইরানে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন এবং লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানে আরও প্রায় ৪ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ইরান ইস্যুতে আরেকটি ‘অনন্ত যুদ্ধের’ ঝুঁকিতে পড়েছেন ট্রাম্প বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন।