দীর্ঘ ৯০ বছরের ইতিহাসে গণিতশাস্ত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত ফিল্ডস মেডেলের প্রাপক তালিকায় নারীরা খুবই বিরল। সেই বিরল কৃতিত্বের ধারায় যুক্ত হলো নতুন একটি নাম। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত কংগ্রেসে চীনা গণিতবিদ হং ওয়াং এই সম্মাননা লাভ করেন। মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই হং ওয়াং ফিল্ডস মেডেল জয়ী তৃতীয় নারী ও প্রথম চীনা নারী হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

১৯৯১ সালে চীনে জন্ম নেওয়া হং ওয়াং অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে, যখন তিনি বেইজিংয়ের পিকিং ইউনিভার্সিটিতে গণিত বিভাগে ভর্তির সুযোগ লাভ করেন। স্নাতক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় (NYU) ও ফ্রান্সের প্রখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট দেস হাউতেস এটুডস সায়েন্টিফিকস (IHES)-এ অধ্যাপনা ও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হলো হারমনিক অ্যানালাইসিস ও জ্যামিতিক পরিমাপ তত্ত্ব। যে কাজের জন্য তিনি এই অনন্য সম্মাননা লাভ করেন তা হলো গণিতের একটি অত্যন্ত জটিল ও পুরনো সমস্যার সমাধান। প্রায় ৫০ বছর ধরে অমীমাংসিত থাকা ত্রিমাত্রিক ‘কাকেয়া অনুমান’-এর (Kakeya conjecture) জটিলতারবি ছেদ ঘুচিয়ে সমাধান প্রদান করে তিনি গোটা গণিতজগতকে চমকে দেন। এই ধারণাটি সহজভাবে একটি জ্যামিতিক সমস্যাকে বোঝায়, যা পরিমাপ করে ত্রিমাত্রিক স্থানের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘের সুই বা রেখাকে সর্বত্র ঘোরাতে ন্যূনতম কতটুকু এলাকার প্রয়োজন হয়।

গণিত সমপ্রদায়ের এই সর্বোচ্চ পুরস্কারটির নামকরণ হয়েছিল কানাডার গণিতবিদ জন চার্লস ফিল্ডসের নামানুসারে। ১৯২০-এর দশকে তিনিই আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী গণিতবিদদের একত্রিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নোবেল পুরস্কারের সাথে এর একটি বড় পার্থক্য হলো, এটি প্রতিবছর দেওয়া হয় না। প্রতি চার বছর অন্তর এই মেডেল প্রদান করা হয় এবং শর্ত অনুযায়ী বিজয়ীর বয়স অবশ্যই ৪০ বছরের কম হওয়া আবশ্যক।

ফিল্ডস মেডেলের ইতিহাসে এ পর্যন্ত পুরস্কৃত ৬৮ জনের মধ্যে নারী সদস্যযর সংখ্যা ছিল মাত্র দুই। ২০১৪ সালে ইরানের মরিয়ম মির্জাখানি প্রথম নারী হিসাবে এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনের মেরিনা ভিয়াজোভস্কা দ্বিতীয় নারী হিসেবে এই মেডেল জয় করেন। ২০২৬ সালে এসে হং ওয়াং এই তালিকার তৃতীয় জন হয়ে প্রমাণ করলেন যে, গণিতের জটিল ও বিমূর্ত জগতেও নারীদের অগ্রযাত্রা নিরন্তর চলছে এবং তারা একের পর এক নতুন সীমা অতিক্রম করছেন।

হং ওয়াংয়ের এই অনবদ্য অর্জন বিশ্বব্যাপী নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে।