শরীরের দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার প্রদাহ নীরবে ডেকে আনতে পারে একাধিক জটিল অসুখ। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই অবস্থা হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, কিছু ধরণের ক্যানসার, বাত ও ফ্যাটি লিভারের মতো রোগের জন্য দায়ী। যদিও আঘাত বা সংক্রমণের বিপরীতে তাৎক্ষণিক প্রদাহ শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ, কিন্তু খাদ্যাভাসের মাধ্যমে ক্রনিক ইনফ্ল্যামেশন নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন খাবারগুলো প্রদাহ কমাতে সহায়ক এবং কোনগুলো পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে, তার একটি স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞদের বরাতে। প্রদাহরোধী খাদ্যতালিকার শীর্ষে রয়েছে প্রতিদিনের নানা রঙের শাকসবজি। এ তালিকায় আছে পালংশাক, লালশাক, কলমিশাক, পুঁইশাক, লাউ, করলা, ঢ্যাঁড়স, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, টমেটো ও কুমড়া। এরপরেই ফলের মধ্যে আমলকী, পেয়ারা, কমলা, মাল্টা, জাম, কালোজাম, আনার, পেঁপে ও পরিমিত মাত্রায় আমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাছের ক্ষেত্রে দেশীয় ছোট মাছের পাশাপাশি বিশেষভাবে বলছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ ইলিশ, রূপচাঁদা ও বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের কথা। মসুর, মুগ, ছোলা ও মটর ডাল, আর বাদাম ও বীজের মধ্যে কাঠবাদাম, আখরোট, চিনাবাদাম, তিল ও চিয়া সিড প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। রান্নায় ব্যবহার্য সরিষার তেল ও অলিভ অয়েল স্বাস্থকর বিকল্প। বাংলাদেশি রান্নার স্বাদ-ঘ্রাণ তৈরি করা মসলাগুলো যেমন হলুদ, আদা, রসুন, দারুচিনি, লবঙ্গ ও গোলমরিচও প্রদাহ প্রতিরোধে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। টক দই ও লাল চালের ভাতের মতো পূর্ণ শয্যও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

বিপরীতে, যেসব খাবার প্রদাহের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, সেগুলোকে যথাসম্ভব পরিহার করতে বলা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে পুরি, সিঙ্গাড়া, সমুচা, পেঁয়াজু, বেগুনি ও চিকেন ফ্রাইর মতো ডুবো তেলে ভাজা খাবার। পাশাপাশি কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, মিষ্টি, কেক, পেস্ট্রি ও আইসক্রিমকে ‘চিনির ভিন্ন রূপ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন চিপস, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, সসেজ ও নাগেটের মতো অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যও প্রদাহ বাড়ায়। এ ছাড়া সাদা পাউরুটি, বিস্কুট, ময়দার তৈরি খাবার, অতিরিক্ত লাল মাংস এবং বারবার একই তেলে ভাজার ফলে সৃষ্ট ট্রান্স ফ্যাটকেও দায়ী করা হয়েছে।

একটি আদর্শ প্রদাহরোধী খাবার প্লেটের ধারণাও দেওয়া হয়েছে। তাতে প্লেটের অর্ধেক ভরতে হবে শাকসবজিতে, এক-চতুর্থাংশে থাকবে ভাত (সম্ভব হলে লাল চাল), আর বাকি এক-চতুর্থাংশে থাকবে মাছ বা ডাল। সঙ্গে এক বাটি টক দই ও সালাদ এবং শেষ পাতে ফল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, একটি মাত্র খাবার কখনোই একা প্রদাহ সৃষ্টি বা নিরাময় করে না; সম্পূর্ণ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধুমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, এবং সার্বিক জীবনযাপনই এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।