খন্দকার সুমন পরিচালিত 'সাঁতাও' চলচ্চিত্রটি তিস্তা নদীর তীরবর্তী জনপদের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন লড়াই ও রূঢ় বাস্তবতার এক জীবন্ত দলিল। প্রান্তিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সংকট, অর্থনৈতিক শোষণ ও পরিবেশগত বিপর্যয়কে শৈল্পিক নিপুণতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই কাজটিতে। একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের কাঠামোতে আটকে থাকলেও, ছবিটি যেন এক বৃহত্তর সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার শিল্পিত ঘোষণাপত্র। ঐতিহ্যবাহী রংপুরি (কামতাপুরি বা রাজবংশী) ভাষা ব্যবহার করে তিস্তাপারের বহমান জীবনকে ক্যানভাসে ধারণ করা হয়েছে, যা একে সময়ের মহাকাব্যিক রূপক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিচ্ছিন্ন খণ্ডচিত্রের মন্তাজের মাধ্যমে সিনেমাটি যেমন মানবিক ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করে, তেমনি দর্শককে গভীর বেদনায় সিক্ত করে। সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রে এটি একটি কালজয়ী সংযোজন বললে অত্যুক্তি হবে না। 'সাঁতাও' কোনো বাণিজ্যিক চটকদার আয়োজন নয়; বরং কৃত্রিম নাটকীয়তার বাইরে মাটির কাছাকাছি পৌঁছানোর এক সৎ ও জেদি শৈল্পিক প্রচেষ্টা।

'সাঁতাও' শব্দটি উত্তরবঙ্গের স্থানীয় একটি প্রাকৃতিক পরিভাষা, যা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে টানা তিন থেকে সাত দিন ধরে চলা বর্ষণকে নির্দেশ করে। তবে ছবিতে এটি শুধু আবহাওয়ার রূপক নয়; এটি তিস্তাপারের মানুষের সংগ্রামমুখর জীবন, তাদের অবিরাম কান্না, চরম বঞ্চনা ও সীমাহীন ধৈর্যের প্রতীক। স্বাধীন ও গণ-অর্থায়নে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনকে নাড়া দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। উত্তরবঙ্গের উপেক্ষিত জনপদ, পরিবেশগত বিপর্যয়, বিলীয়মান লোকসংস্কৃতি ও রাজনীতির জটিল মনস্তত্ত্বকে এটি পরম মমতায় ধারণ করেছে। চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক সততা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে উত্তরবঙ্গ (বিশেষ করে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট অঞ্চল) উপেক্ষিত ছিল বা অতিনাটকীয়ভাবে উপস্থাপিত হতো। কিন্তু 'সাঁতাও' তিস্তার ধু ধু বালুচর, রুক্ষ মেঠো পথ ও মঙ্গাপীড়িত চরাঞ্চলের মানুষের অবয়বকে কোনো কৃত্রিম সেটে নয়, বরং প্রামাণ্যচিত্রের মতো জীবন্ত করে তুলেছে।

কেন্দ্রীয় চরিত্র ফজলু প্রচলিত অর্থে ভূমিহীন বর্গাচাষি নয়; সে নিজের জমিতেই চাষ করে, তবে জমির পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য। এই জমি বন্ধক রেখে তাকে একসময় রাজধানী ঢাকায় পাড়ি জমাতে হয়। ছবির শেষে ঢাকার একটি রিকশা গ্যারেজে ফজলুর সংলাপে শোনা যায়, তার বন্ধকি জমি এবার ছাড়ানো জরুরি। এই সংকটের ইঙ্গিত মেলে ছবির শুরুতেই, যখন পানির ঝামেলায় সে নিজের জমি ও অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়। ফজলুর জমি হারানোর মানসিক টানাপোড়েন পরিচালক চমৎকার কিছু মন্তাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন, পুতুল যখন ফজলুর হাত থেকে ভাতের প্লেট ফেলে দেয়, তখন ফজলুর মস্তিষ্কে তীব্র মানসিক তোলপাড়ের মন্তাজ দৃশ্য দেখা যায়—সে একা দলিল হাতে জমির মাঝে দাঁড়িয়ে, আর সামনে ইদ্রিস দেওয়ানী। এই পরাবাস্তব দৃশ্যের সত্যতা পরে বাস্তবে উন্মোচিত হয়, যখন ইদ্রিসের গদিঘরে ফজলু জমি বন্ধক দিতে বাধ্য হয়। চরের খামখেয়ালি প্রকৃতির সঙ্গে ফজলুর এই নিঃসীম লড়াই নিবিড়ভাবে না দেখলে বোঝা যায় না। 'সাঁতাও' চোখের সামনে এই প্রাণহিম করা বাস্তবতা তুলে ধরে।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুতুল চরিত্র। ফজলুর নবপরিণীতা স্ত্রী পুতুল বিয়ের পর রুক্ষ বালুচরে এসে চরম একাকিত্বে ভোগে। ফজলু তার একাকিত্ব দূর করতে ও সংসারে সচ্ছলতা আনতে একটি গাভি উপহার দেয়, যার নাম রাখা হয় 'লালু'। গ্রামীণ সমাজে গবাদিপশু নিছক অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, তা হয়ে ওঠে মমতার পরম পৃথিবী। পুতুলের জীবনে লালু হয়ে ওঠে পরম আশ্রয়, তার মাতৃত্বের প্রতীক ও অবদমিত অনুভূতির প্রকাশ। পুতুলের অপারেশনের পর যখন সে জানতে পারে সে আর মা হতে পারবে না, তখন কাঁদতে কাঁদতে লালুর কথা মনে করে। কিস্তি শোধ করতে না পারায় এনজিওর লোকজন যখন জোর করে গাভিটি নিয়ে যায়, তখন পুতুল আছাড় খেয়ে চিৎকার করে বলে, 'লালু...মুই তোক ছাড়ি বাঁচপার নং...' শেষ পর্যন্ত দেনার দায়ে গাভিটি বিক্রি হয়ে যায়, কিন্তু পুতুলের আর্তনাদ সহ্য করতে না পেরে ফজলু 'লালু'কে পুনরুদ্ধার করতে যায়। এই প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'মহেশ' গল্পের গফুর ও তার 'মহেশ'-এর ট্র্যাজেডির কথা মনে পড়ে যায়। 'সাঁতাও'-এর ফজলু পুঁজিবাদী সমাজ, এনজিও ও মহাজনি ঋণের জাঁতাকলে পিষ্ট এক প্রান্তিক চাষি। নিজের জমি বাঁচানোর তাগিদে ও চরের খরা-নদী সংকটের মুখে তারা লালুকে রক্ষা করতে হিমশিম খায়। সমাজ যখন ফজলু-পুতুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা ও লালুর প্রতি মমত্ববোধই টিকে থাকার শেষ খড়কুটো হয়ে ওঠে।

'সাঁতাও'-এ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের জটিল বিষয়গুলো মূর্ত হয়েছে গভীর শৈল্পিক মমতায়। যে সামাজিক কাঠামো থেকে বেদনাদায়ক সমস্যাগুলো তৈরি হয়, তার ব্যবচ্ছেদও করতে সক্ষম হয়েছে চলচ্চিত্রটি। প্রান্তিক চাষি ফজলু সামন্ততান্ত্রিক গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় শোষিত-বঞ্চিত। মহাজন ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের দাপটের মুখে সে প্রতিনিয়ত কোণঠাসা। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সারের কৃত্রিম সংকট ও দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের জাল—সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির নগ্ন শোষণ উঠে এসেছে এতে। পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থা কীভাবে একজন স্বাধীন কৃষককে শেষ পর্যন্ত শ্রমদাসে পরিণত করে এবং তাকে ভিটেমাটি ছাড়া করে, তার নিখুঁত সমাজতাত্ত্বিক বিবরণ রয়েছে। অন্যদিকে, শহুরে সমাজের নির্মমতা ও উদাসীনতাও পর্দায় দেখানো হয়েছে। আমরা শুনি, 'এ শহরে সত্যি কোনো মাটি নেই।' ছবির শেষ দৃশ্যে ভিটেমাটি ছেড়ে ফজলু রাজধানীতে রিকশাচালক। মুঠোফোনে স্ত্রীর সঙ্গে তার আবেগঘন কথোপকথনে ভেসে আসে ভাওয়াইয়ার করুণ সুর।

পরিবেশ সংকট উপস্থাপন 'সাঁতাও'-এর সবচেয়ে যুগান্তকারী দিক। উত্তরবঙ্গের প্রধান সমস্যা আন্তর্জাতিক পানিবণ্টনের রাজনীতি ও নদীর নাব্যতা সংকট। তিস্তা নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যাওয়া, আবার কখনো অসময়ে উজান থেকে ধেয়ে আসা আকস্মিক বন্যা—এই দুই চরম সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট চরাঞ্চলের মানুষ। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও উজানের দেশের একতরফা নদীশাসনের ফলে কীভাবে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, তার সরাসরি শিকার হচ্ছে পুতুল বা ফজলুর মতো নিরপরাধ মানুষ। নদীর বুক শুকিয়ে বালুচর হওয়া আর পুতুলের চোখের জল শুকিয়ে যাওয়া একই বিন্দুতে মিলেছে।

কারিগরি দিক থেকে 'সাঁতাও' মিতব্যয়ী অথচ নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ। সিনেমাটোগ্রাফার সজল হোসেন ও ইশতিয়াক আহমেদ টিঙ্কু চরের আলোছায়াকে চমৎকারভাবে ক্যামেরায় ধরেছেন। কোনো কৃত্রিম চাকচিক্য নেই; মাটির কাছাকাছি থাকা প্রাকৃতিক রঙে ক্যানভাস সাজানো হয়েছে। 'ওয়াইড শট' ও 'লং শট' চরের দিগন্তবিস্তৃত শূন্যতা ও মানুষের ক্ষুদ্রতাকে ফুটিয়ে তোলে। শব্দ পরিকল্পনাও প্রশংসনীয়; কৃত্রিম আবহসুরের চেয়ে প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ—বাতাসের শোঁ শোঁ, পানির কলধ্বনি, ঝিঁঝিপোকার ডাক—ব্যবহার করা হয়েছে। অভিনয় প্রসঙ্গে ফজলুল হক ও আইনুন পুতুলের অভিনয় এতটাই বাস্তবসম্মত যে মনে হয়নি তাঁরা পেশাদার অভিনেতা; মনে হয়েছে, তাঁরা সেই চরেরই দুঃখপীড়িত মানুষ। কোনো মেলোড্রামা বা অতিরিক্ত অঙ্গভঙ্গি নেই, সম্পূর্ণ পরিমিত ও স্বাভাবিক অভিনয়।

'সাঁতাও' কোনো করপোরেট অর্থায়নে তৈরি হয়নি; এটি সম্পূর্ণ গণ-অর্থায়নে নির্মিত স্বাধীন চলচ্চিত্র। ভারতের ৫৩তম 'ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া' (আইএফএফআই)-এ 'ইন্টারন্যাশনাল সিনেমা' বিভাগে প্রদর্শিত হয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছে। 'ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব'-সহ বিভিন্ন ফোরামে এর চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও পরিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পুরস্কৃত হয়েছে। এই স্বীকৃতি প্রমাণ করে যে সততা ও শৈল্পিক নিষ্ঠা থাকলে সীমিত বাজেটেও বিশ্বমানের সিনেমা বানানো সম্ভব। খন্দকার সুমনের 'সাঁতাও' (১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট) হালকা বিনোদন নয়; এটি তিস্তাপারের মানুষের জীবনসংগ্রাম, পরিবেশগত বিপর্যয় ও সামাজিক বৈষম্যের এক ঐতিহাসিক দলিল। শেষে কোনো কৃত্রিম সুখকর পরিণতি নেই; বরং বাস্তবতার চরম নির্মমতা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে দর্শকের ভাবনার জন্য। সিনেমাটি শেষ হওয়ার পরও দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী হাহাকার রেখে যায়; যেখানে তিস্তার চরের বাতাসে ও পুতুলের কান্নায় মিশে যায় ভাওয়াইয়ার কালজয়ী করুণ সুর।