ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরতীরবর্তী ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার এক অভিজাত হোটেলের কক্ষ থেকে উদ্ধার হয় এক প্রভাবশালী সরকারি কৌঁসুলির মরদেহ। কে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেই চিরায়ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় ক্ষমতা, শ্রেণিবৈষম্য আর ব্যক্তিগত ক্ষোভের জটিল সমীকরণ। একটি সফল রহস্যগল্পের মূল সূত্র ধরে ‘সামার ’৩৬’ শুধু অপরাধীর পরিচয় নয়, বরং খুনের কারণটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে।
আগাথা ক্রিস্টির ধাঁচের ‘হু ডান ইট’ রহস্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মাতা মাই দেশায়ের ও ক্যাথরিন তুজে এই ছয় পর্বের ফরাসি মিনি সিরিজকে বাস্তব ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ে স্থাপন করেছেন। ১৯৩৬ সালের ফ্রান্সে সদ্য ক্ষমতায় আসা পপুলার ফ্রন্ট সরকার লাখো শ্রমিকের জন্য প্রথমবারের মতো বেতনসহ ছুটির অধিকার চালু করে। ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার যে সমুদ্রসৈকত ও বিলাসবহুল রিসোর্টগুলি এতদিন ছিল অভিজাতদের একচেটিয়া আথিয়ী, সেখানে সাধারণ শ্রমিক পরিবারের পা পড়ে এই ঐতিহাসিক সামাজিক পরিবর্তনের পরেই।
এই ঘটনা-আইমূলে হোটেলের একটি কক্ষ থেকে নিহত হন প্রভাবশালী সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকার। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে আসে হোটেলে অবস্থানরত চার নারীর ব্যক্তিগত ক্রোধ, অসমাপিত হিসাব এবং সুদূর অতীতের গোপন সম্পর্কের ইতিহাস। কেন্দ্রীয় এই চার চরিত্র—ইউজেনি বার্থিয়ে (সোফিয়া এসাইদি), লিওনি মোরেল (কনস্ট্যান্স গে), ব্লঁশ আকেরমান (জুলি দ্য বোনা) এবং জুলিয়া ভিনসেন্ট (নলওয়েন লেরয়)—সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে এসেছেন। কোনো চরিত্রের সঙ্গে জাকারের পুরনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল, কারও জীবনে তিনি অবিচারকের প্রতিনিধি, আবার কোনো সম্পর্ক ছিল আর্থিক লেনদেন-কেন্দ্রিক। এদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ইউজেনি ও লিওনি; একজনের গল্পে ব্যক্তিগত জীবন ও অতীতের আবেগ, অন্যজনের গল্পে নিজের বাবাকে বাঁচানোর লড়াই ও ন্যায়বিচারের প্রস্ন প্রখরভাবে মূর্ত হয়েছে।
সিরিজটির শক্তি হিসেবে কাজ করেছে নির্মাণের সত্মততা। ১৯৩০ দশকের পোশাক, ধ্রুপদী গাড়ি ও হোটেলের অভ্যান্তরীণ সাজসজ্জা দৃশ্যগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। ফ্রান্সের নিস, গ্রাস ও সসপেল শহরের বাস্তব লোকেশনে করা শুটিং পর্দায় ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার রূপকে জীবন্ত করে তোলে। একইসঙ্গে অভিনেত্রীরাও নিজ নিজ চরিত্রে সফল। সোফিয়া এসাইসির ‘ইউজেনি’ সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন; কনস্ট্যান্স গে ‘লিওনি’র দৃঢ়তা ও অসহায়ত্ব উভয়ই দক্ষতার সাথে প্রকাশ করেন।
তবে চিত্রনাট্যের কিছু দুর্বলতা সিরিজটিকে কেবলই আঁটসাঁট রেখেছে। ছয় পর্বের ভেতর একাধিক নারীকে ঘিরে অসংখ্য পারিবারিক সম্পর্ক, পুরোনো গোপন তথ্য ও নতুন চরিত্রের সমাহার প্রায়ই মূল রহস্যের সুতো ধরে রাখাকে কঠিন করে তোলে। বিশেষত প্রথম দুই পর্বে দর্শককে বুঝতে যথেষ্ট মনোযোগ দিতে হয় যে কে কার সঙ্গে সংযুক্ত। মধ্যভাগে কাহিনির গতি কিছুটা স্থিমিত হয়ে পড়ে, যা রহস্যের উত্তেজনা হ্রাস করে। আরও বেশি সংক্ষিপ্ত ও সুসংহত কনজাপ্ট হলে কাজটি আরও সাফল্য পেত। ১৯৩৬ সালের শ্রমিক-অভিজাত দ্ধন্দ্বটি শুধু প্রেক্ষাপট নয়, চরিত্রগুলির সিদ্ধান্ত ও সম্পর্ককেও প্রভাবিত করেছে; যদিও এই দিকটিকে আরও গভীরতা দেওয়ার সুযোগ ছিল।
সার্বিক বিবেচনায় ‘সামার ’৩৬’ একটি নিখুঁত মির্ডার মিস্ট্রি না হলেও, পরিবর্তনশীল এক সমাজের আলেখ্য রূপে স্বতন্ত্র। চিত্রনাট্যের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, ইউরোপীয় ঐতিহাসিক রহস্য ধারার অনুরাগীদের জন্য এটি নিশ্চিতভাবেই একবার দেখার মতো একটি নেটফ্লিক্স সিরিজ। প্রসঙ্গত, ফ্রান্সের টেলিভিশনে সম্প্রচারের পর এটি নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে ১ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পায়।


