দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে নিয়ম-কানুন থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও শোরগোল সৃষ্টি হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে। সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে গত শুক্রবার বিষাক্ত গ্যাসে নয়জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। ছয় মাস আগে সরকারি পরিদর্শনে ওই কারখানায় একাধিক নিরাপত্তা ঘাটতি ধরা পড়েছিল, কিন্তু তা সংশোধনের আগেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে জাহাজভাঙা শিল্পে ১৩৭ শ্রমিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মৃত্যু হয় আরও তিনজনের। সর্বশেষ সীতাকুণ্ডের ওই দুর্ঘটনায় নয়জন মারা যাওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৯ জনে।

দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয় ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গত শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন শিল্পসচিব আবদুন নাসের খান ও তদন্ত কমিটির সদস্যরা। শিল্পসচিব জানান, যে স্থানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রাথমিক পরীক্ষায় হাইড্রোজেন সালফাইডের মাত্রা ১০ দশমিক ৮ পিপিএম পাওয়া গেছে। তবে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হওয়ার সময় গ্যাসটির মাত্রা কত ছিল তা জানা যায়নি।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গত ৯ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিল পরিদর্শন করেন। তখন শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন না করা, ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন না দেওয়া এবং কর্মঘণ্টা–সংক্রান্ত অনিয়ম ধরা পড়ে। শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো শ্রমিককে নির্ধারিত আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানো হতো, কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের টাকা দেওয়া হতো না। পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে একাধিক নোটিশ ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। যথাযথ জবাব না পাওয়ায় গত জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করে অধিদপ্তর। তার এক মাসের মধ্যেই ঘটল বড় দুর্ঘটনা।

ফেরদৌস স্টিলের কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ অবশ্য নিরাপত্তাঘাটতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ইয়ার্ডে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রীর ব্যবহার নিশ্চিত করেই শ্রমিকদের কাজে নামানো হয়। তবে শ্রম আদালতে মামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলেও মন্তব্য করেন।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, হাইড্রোজেন সালফাইড বর্ণহীন ও অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। কম মাত্রায় পচা ডিমের মতো গন্ধ থেকে এর উপস্থিতি বোঝা যায়। মাত্রা বাড়লে চোখ ও শ্বাসতন্ত্রে জ্বালা, শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যা হতে পারে। কোনো বদ্ধ ট্যাংকে দীর্ঘদিন পানি, স্লাজ বা পচনশীল জৈব পদার্থ আটকে থাকলে এবং অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে এই গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে।

বিলসের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার ধরন ভিন্ন হলেও ঝুঁকির অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় ভারী গার্ডার বা অন্য বস্তু পড়ে ৯টি, ক্রেন-হুক-তার সংক্রান্ত ৮টি এবং আগুন ও দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ৫টি। সংস্থাটি অনিরাপদ কর্মপদ্ধতি, ত্রুটিপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি, দুর্বল তদারকি ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এদিকে নিহত ৯ জনের মধ্যে ৮ জনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি এবং পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়। শুধু আবদুল আলীমের ময়নাতদন্ত হয়েছে। ঘটনার এক দিন পরও কোনো মামলা হয়নি। নিহতদের পরিবারগুলো এককভাবে মামলা করতে চাইছে না। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, পরিবার মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে। জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।