বেক্সিমকো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাধারণ নীতিমালা অনুযায়ী কোনো গ্রুপ খেলাপি হয়ে গেলে তার কোনো অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পায় না। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনে জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে শাইনপুকুর সিরামিকসের উৎপাদন কার্যক্রম ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সোনালী ব্যাংক ঋণপত্র সুবিধা চালু রাখবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কেবল কাঁচামাল আমদানির উদ্দেশ্যে এবং শতভাগ মার্জিনের বিনিময়ে এই এলসি খোলা যাবে। এই বিশেষ সুবিধার জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭ কক (৩) ধারার বিধান ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। উল্লিখিত ধারায় বলা আছে, কোনো গ্রুপ ঋণে খেলাপি হলে গ্রুপভুক্ত কোনো কোম্পানিকে ঋণ বা ঋণসুবিধা দেওয়া যাবে না।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, শাইনপুকুর সিরামিকসের সকল আয় একটি নির্ধারিত হিসাবে জমা করতে হবে এবং সেই তহবিল থেকে আনুপাতিকভাবে সোনালী ব্যাংকের প্রাপ্য নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে। এই ঋণ সুবিধার কারণে অর্থ বিভাগ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো আর্থিক দায় তৈরি হবে না। একইসঙ্গে, ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক এই বিষয়ে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা চাইতে পারবে না বলেও প্রজ্ঞাপনে পরিষ্কার করা হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেছেন, শাইনপুকুরের প্রকল্পটি সক্রিয় আছে এবং সেখান থেকে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রয়েছে। গ্রুপটির অন্য ঋণে সমস্যা থাকলেও এই বিশেষ প্রতিষ্ঠানটি ভালো অবস্থায় আছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সেই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সুবিধার ফলে কারখানাটির ব্যবসা চালু থাকবে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড বা বেক্সিমকো দেশের একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ১৯৭২ সাল থেকে সোহেল এফ রহমান ও সালমান এফ রহমান এই গ্রুপটি পরিচালনা করে আসছেন। ওষুধ, সিরামিক, টেক্সটাইল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মিডিয়া, তথ্যপ্রযুক্তি, আবাসনসহ বিভিন্ন খাতে তাদের বিনিয়োগ রয়েছে। গ্রুপটির ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ছিলেন। দেশের ১৬টি ব্যাংক ও ৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেক্সিমকো গ্রুপের মোট খেলাপি ঋণ ও দায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গ্রুপটির মাত্র তিনটি কোম্পানি চালু আছে; বাকি প্রায় সব কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বেক্সিমকোর ১৮৮টি কোম্পানির মধ্যে ৭৮টি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে। শুধু জনতা ব্যাংকের দেনাই ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বেক্সিমকো শিল্পপার্কের ৩২টি কারখানার নামে ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হলেও ১৬টি কারখানার বাস্তব অস্তিত্বই নেই। জনতা ও সোনালী ব্যাংকের পাশাপাশি অগ্রণী, রূপালী, ইউসিবি, এবি, আইএফআইসি, ডাচ্-বাংলা ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতেও গ্রুপটির বিপুল অঙ্কের ঋণ রয়েছে। এসব ঋণের চাপে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যার মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানাগুলো চালুর চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সফল উদ্যোগ দেখা যায়নি।

