ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ ও সর্বজনীন করতে গত জুলাই মাস থেকে সব ব্যাংক ও মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোড বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই একীভূত কোড ব্যবহারের ফলে এখন যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ বা এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমেই একক কোড স্ক্যান করে লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের নিজস্ব পৃথক কিউআর কোড থাকায় আন্তঃলেনদেনে জটিলতা ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে, যার আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা। তবে পুরো ডিজিটাল লেনদেনের চিত্র বিবেচনায় এই অঙ্ক খুবই সামান্য। ব্যাংকের কার্ড ও এমএফএসের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে, যার বড় অংশ এখনো বাংলা কিউআরের আওতায় আসেনি।
এই সেবার প্রসারে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে খুচরা বিক্রেতাদের অংশগ্রহণ। ছোট মুদিদোকানি থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান—সবাইকে বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে গেলে ১ শতাংশ মাশুল দিতে হচ্ছে। অথচ আগে ছোট ব্যবসায়ীদের অনেককেই কোনো মাশুল দিতে হতো না। মাশুলের বোঝা তাদের কিউআর কোড ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে বলে জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, খাতভিত্তিক মাশুল নির্ধারণ বা শুরুর দিকে বিনা মাশুলে সেবা চালু করলে বিক্রেতাদের আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ব্যাংক বা এমএফএসে রিটেইল হিসাব খোলার প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পূর্ণ ডিজিটাল নয়। অনেক বিক্রেতা প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে এই হিসাব খুলতে পারছেন না, যা ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে বড় বাধা।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, একজন খুচরা বিক্রেতাকে বাংলা কিউআরের আওতায় আনতে কমপক্ষে ৫০০ টাকা খরচ হয়। এই খরচের বিপরীতে কোনো প্রণোদনা না থাকায় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোরও আগ্রহ কম। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, প্রাথমিক অবস্থায় ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া থাকলে সেবাটির প্রসার আরও দ্রুত হতো। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরব। আশা করছি, ডিজিটাল অর্থনীতির স্বার্থে সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।’
সেবাটি চালুর পর থেকে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যাও দেখা দিয়েছে। গ্রাহকদের একটি বড় অংশ এখনো তাদের অ্যাপ হালনাগাদ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে কিউআর কোড বা হিসাবে ত্রুটি ও নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে লেনদেন ব্যর্থ হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ধীরে ধীরে এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি হওয়ায় ঝুঁকি নেই বলেও জানিয়েছেন তারা।
বাংলা কিউআর চালুর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দৈনিক গড়ে সাত কোটি টাকা এবং মার্চে সাড়ে ছয় কোটি টাকা লেনদেন হতো। বাধ্যতামূলক করার পর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে গড়ে ১০ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা পরের সপ্তাহে বেড়ে দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকায়। তবে ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমেই দৈনিক ৩০০ কোটি টাকার বেশি কেনাকাটা হয়। এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে বাংলা কিউআরে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, দুর্নীতি দূর করতে ডিজিটাল লেনদেনের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়াতে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যাতে সেবাটি বাধাগ্রস্ত হয়।’ বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ১৭ লাখ কিউআর কোড রয়েছে, যার মধ্যে বিকাশের অ্যাপেই রয়েছে পাঁচ লাখ। এছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিউআর কোড রয়েছে।


