একদিকে টানা বর্ষণ ও কোমরসমান জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে গণপরিবহন–সংকট — এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতেও রাজধানীর বেসরকারি চাকরিজীবীদের অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতায় দেরির জন্য কোনো ছাড় না থাকায় ভিজতে ভিজতেই কর্মস্থলে পৌঁছান তাঁরা। কিন্তু যাতায়াতের এই দৃশ্যমান যন্ত্রণা ছাপিয়ে অফিসের অভ্যন্তরে একটি নীরব, কাঠামোগত শোষণের মুখোমুখি হন কর্মীরা। গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো করপোরেট পোশাকের আড়ালে মাস শেষে তাঁদের পকেট শূন্য থেকে যায়। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে যাতায়াত ভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে মৌলিক ও মানবিক অধিকারবোধ প্রায় হারিয়ে ফেলেন এই কর্মীরা।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রধান সংকট হলো বছরের পর বছর আটকে থাকা পদোন্নতি এবং নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি। একটি বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ বছর ধরে একই পদে থাকা অর্ণব রহমান জানান, কাজের চাপ দ্বিগুণ হলেও তাঁর ইনক্রিমেন্ট হয়েছে নগণ্য। ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতির মধ্যে স্থির বেতনে টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শ্রম আইনে সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা কাজের কথা থাকলেও বাস্তবে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা শ্রম দিতে হয়, যার কোনো ওভারটাইম বা যাতায়াত ভাতা মেলে না।

রপ্তানিমুখী একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যস্তরের কর্মকর্তা আহসান মিজু একই চিত্র তুলে ধরে বলেন, কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই, ছুটির দিনেও অফিসের কাজ করতে হয়। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও চাটুকারিতার সংস্কৃতিতে যোগ্য ব্যক্তিরা অবমূল্যায়িত হন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু বসের সুনজরে না থাকার কারণে অনেকের পদোন্নতি থমকে থাকে। এই পরিস্থিতি সৎ কর্মীদের প্রতিনিয়ত মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়।

এই শোষণচিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন সামান্য অজুহাতে বা ব্যক্তিগত ক্ষোভের জেরে ছাঁটাইয়ের খাঁড়া নেমে আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি গণমাধ্যমকর্মী জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে বসের ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে এক সহকর্মীকে হঠাৎ চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং অন্যায় অজুহাতে তাঁর পাওনা অর্থও আটকে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি চাকরিতে কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই, যেকোনো মুহূর্তে চাকরি হারাতে পারেন একজন কর্মী।

সরকারি খাতের নতুন পে কমিশনের সুপারিশের আলোকে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পথে, যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি করে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি কর্মীদের অবস্থা অন্ধকারাচ্ছন্ন। শ্রম বিধিমালা-২০১৫ অনুযায়ী প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি বা গ্রুপ ইনস্যুরেন্সের মতো বাধ্যতামূলক সুবিধাগুলো দেশের অধিকাংশ মালিকপক্ষ খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। ফলে কর্মীদের চাকরির স্থায়িত্ব, পেনশন বা ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা বলতে কিছুই নেই। বেসরকারি খাতের জন্য একটি নতুন ‘সার্ভিস রুলস’ তৈরির সরকারি উদ্যোগের খসড়া পর্যালোচনা মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জুলাই পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

নগর ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত সংকটে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া এই সময়ের পুরো আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি এককভাবে বহন করছেন বেসরকারি কর্মীরাই। রাস্তায় নষ্ট সময়ের কারণে উৎপাদনশীলতা কমে, আর সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয় তাঁদের। বৃষ্টি থামলে রাস্তার জলজট সাময়িকভাবে কাটলেও বেসরকারি খাতের কোটি কোটি চাকরিজীবীর জীবনে বেতন স্থবিরতা ও অদৃশ্য শোষণের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।