চল্লিশ থেকে ষাটের দশকে বলিউড কাঁপানো কিংবদন্তি অভিনেত্রী মধুবালা। তাঁকে একসময় 'ভেনাস' ও হলিউডের মেরিলিন মনরোর সঙ্গে তুলনা করা হলেও সমালোচকদের চোখে তাঁর সৌন্দর্য ছিল দীপ্ত, অভিনয়ে ছিল সংযম, আর ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তা। রুপালি পর্দার এই আলোকবর্তিকা ব্যক্তিজীবনে দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক বেদনাময় নাম। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রেখে গেছেন এক করুণ মানবিক কাহিনি। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দুই-ই ফেব্রুয়ারিতে। পারিবারিক নাম মমতাজ জাহান দেহলভী হলেও সময় তাঁকে চিনেছে মধুবালা নামেই। জন্মদিন উপলক্ষ্যে আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে এসেছে সেই তারকার নাম, যাঁকে কেবল ‘বিউটি আইকন’ বলে সীমায়িত রাখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। সাদাকালো পর্দার চিরকালের ‘আনারকলি’-র গল্প আজ জানব।
১৯৩৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লির এক নিঃস্ব পরিবারে জন্ম নেওয়া মমতাজ জাহানের বাবা ছিলেন পেশোয়ারি পাঠান, যিনি এক তামাক কোম্পানিতে কাজ করতেন। চাকরি হারানোর পর ভাগ্যের খোঁজে পরিবারটি বোম্বেতে পাড়ি দেয়। কিন্তু সেখানেও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসেনি, ছোট একটি ঘরে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হতো। একের পর এক ভাইবোন হারানোর শোকও সঙ্গী ছিল। ১৯৪৪ সালে বোম্বে ডকের ভয়াবহ বিস্ফোরণে তাদের বসতির ঘরটি ধ্বংস হওয়ায় একমুহূর্তে আবার নিঃস্ব হয়ে দাঁড়াতে হয় পরিবারকে। এই কঠিন বাস্তবতার কারণে মমতাজের কাছে অভিনয় ছিল শখ নয়, ছিল পরিবারের বাঁচার পথ। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। অল্প বয়সেই তাঁর বুদ্ধিমত্তা, পরিশ্রমী মানসিকতা ও দৃঢ়চেতা মনোভাব পরিচালক-প্রযোজকদের নজর কাড়ে।
সে সময়কার প্রভাবশালী অভিনেত্রী দেবিকা রানী তাঁর সৌন্দর্য ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে 'মধুবালা' নাম দেন। নাম বদলের সাথে সাথে বদলাতে থাকে ভাগ্যও। ১৯৪৭ সালে 'নীল কমল' চলচ্চিত্রে প্রধান নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। রাজ কাপুরের বিপরীতে সেই ছবিতে কিশোরী বয়সেই তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত। ১৯৪৯ সালের 'মহল' ছবিটি মধুবালার জীবনকে বদলে দেয়। কামাল আমরোহী পরিচালিত রহস্যময় আবহাওয়া ও গা ছমছমে গল্পের এই ছবিতে পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল একই সঙ্গে মোহময় ও রহস্যে মোড়া। দর্শক তখন যেন এক নতুন নায়িকাকে আবিষ্কার করলেন, যার সৌন্দর্য কেবল দৃশ্যমান নয় অনুভবযোগ্যও। 'মহল'-এর সাফল্যের পর 'দুলারি', 'বেকসুর', 'তারানা', 'বাদল'-এর মতো ধারাবাহিক হিট ছবিতে তিনি বক্স অফিসের নিশ্চয়তায় পরিণত হন। তাঁর অভিনয় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, সহ-শিল্পীদের ছাপিয়ে নিজের দীপ্ত উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতেন কখনো নাটকীয়তার আশ্রয় ছাড়াই।
তাঁর খ্যাতি ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ১৯৫২ সালে আমেরিকার প্রভাবশালী ম্যাগাজিন 'থিয়েটার আর্টস' তাঁকে 'বিগেস্ট স্টার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড' আখ্যা দেয়, যা সেসময়ে এক ভারতীয় অভিনেত্রীর জন্য ছিল বিরল সম্মান। অস্কারজয়ী নির্মাতা ফ্রাঙ্ক কাপরার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পরিবার ও বিশেষ করে বাবার আপত্তির কারণে তাঁর হলিউডযাত্রা সম্ভব হয়নি। ১৯৫১ সালের 'তারানা' ছবির সেটে দিলীপ কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা পরে রূপ নেয় বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনির একটিতে। সাত বছরের ওই সম্পর্কে সূচনা হয় যখন মধুবালা তাঁর হেয়ারড্রেসারের হাতে একটি লাল গোলাপ ও চিরকুট দিয়ে বার্তা পাঠান—'ভালোবাসলে ফুলটি গ্রহণ করবেন।' দিলীপ কুমার সেই ভালোবাসা গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৯৫৭ সালে 'নয়া দৌড়' ছবির শুটিংকে কেন্দ্র করে বিষয়গুলো জটিল রূপ পায়। মধুবালার বাবা আতাউল্লাহ খান মেয়েকে আউটডোর শুটিংয়ে ভোপালে যেতে বাধা দিলে প্রযোজনা সংস্থা বৈজয়ন্তীমালাকে নিয়ে ছবিটি সম্পন্ন করে এবং পারিশ্রমিক ফেরতের মামলা আদালতে গড়ায়। সেখানে দিলীপ কুমার পেশাদারি দৃষ্টিকোণ থেকে সত্য সাক্ষ্য দেন, যা পিতৃভক্ত মধুবালাকে গভীরভাবে আঘাত করে। তিনি আশা করেছিলেন দিলীপ কুমার বাবার কাছে ক্ষমা চাইবেন, কিন্তু দিলীপ কুমারের মতে তা ভিত্তিহীন ছিল। সম্পর্কের অবসানের পেছনে এই অহং ও অভিমান বড় ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে দিলীপ কুমার বিয়ের শর্ত দেন পরিবার ত্যাগ করার, যাতে মধুবালা রাজি না হওয়ায় চূড়ান্ত ভাঙন আসে। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নাকি মধুবালা তাঁকেই সবচেয়ে বেশী ভালোবেসেছিলেন।
'মুঘল-ই-আজম' চলচ্চিত্রনির্মাণের সময় তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছিল, তবু ক্যামেরার সামনে তার ছাপ পড়েনি। আনারকলির কারাবন্দি দৃশ্যগুলোতে ভারী পোশাক ও ধাতব শিকল নিয়ে শুটিংয়ের পর তার হাত-পা নীল হয়ে যেত। কারণ তার হৃদ্যন্ত্রে ছিল জন্মগত ছিদ্র। ১৯৬০ সালে ছবিটি ইতিহাস সৃষ্টি করলেও, তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে। একই বছর তিনি গায়ক কিশোর কুমারকে বিবাহ করেন। বিয়ের পর লন্ডনে চিকিৎসার জন্য গেলেও করোনারি রোগের জটিলতায় আরোগ্য সম্ভব ছিল না। শুটিং ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী কাটাতে হয় তাকে। শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা ও রক্তবমির মতো উপসর্গ তাঁকে ঘিরে ধরে। প্রায় নয় বছর ভোগার পর তিনি কাছের লোকদের নিয়মিত বলতেন, 'আমি বাঁচতে চাই।' কিন্তু ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, নিজের জন্মদিনের মাত্র ৯ দিন পর মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মধুবালা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মুম্বাইয়ের জুহু মুসলিম করবস্থানে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
মৃত্যুর পর মধুবালা হয়ে উঠেন এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। গুগল ডুডল, ডাকটিকিট সবখানেই তিনি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন ও প্রেম নিয়ে বায়োপিক বানোয়ার কথা বারবার উঠে এসেছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও আজও বিস্ময়ের সঙ্গেই উচ্চারিত হয় এই ক্ষণজীবী অথচ অসাধারণ শিল্পীর নাম, যাঁর জীবনপিপাসা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় বেঁচে থাকার আকুলতাকে।



